ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি মঙ্গলবার এক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে প্রতিবেশী দেশ তুরস্ক সফর করছেন বলে আল জাজিরা ও এএফপি নিশ্চিত করেছে। গত মে মাসে ক্ষমতা গ্রহণের পর এটিই তার প্রথম সরকারি তুরস্ক সফর, যেখানে তিনি দুই দেশের মধ্যকার কৌশলগত সহযোগিতা, নিরাপত্তা, পানি ও অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন বলে সরকারি মুখপাত্র হায়দার আল-উবুদি জানিয়েছেন। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন এবং তেল রপ্তানি সংক্রান্ত নতুন চুক্তির প্রেক্ষাপটে এই সফরটিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া আঞ্চলিক সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে বাগদাদের কাছে আঙ্কারার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল রপ্তানি পুনরায় চালু এবং তা বৃদ্ধি করার জন্য তুর্কি কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে ইরাক সরকার। দুই দেশের মধ্যকার পূর্ববর্তী তেল রপ্তানি চুক্তি সোমবার মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে নতুন একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে উভয় পক্ষই দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরাকের তেল মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র আল জাজিরাকে জানিয়েছে যে পুরোনো চুক্তিটি এক বছরের জন্য নবায়ন করার উদ্দেশ্যে একটি কারিগরি প্রতিনিধিদল গত সপ্তাহের শেষের দিকে আঙ্কারায় পৌঁছায়। তবে তুরস্কের নতুন শর্তগুলো ইরাকের জন্য মেনে নেওয়া বেশ কঠিন বলে সরকারি ওই কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন। বিশেষ করে তুরস্ক প্রতিটি ব্যারেল তেলের জন্য ট্রানজিট ফি বর্তমানের এক দশমিক তিন পাঁচ মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে সাত মার্কিন ডলার করার দাবি জানিয়েছে এবং রপ্তানির ন্যূনতম পরিমাণ দৈনিক পনেরো লক্ষ ব্যারেল রাখার শর্ত জুড়ে দিয়েছে।
ইরাক সরকারের পক্ষে এই ধরনের বড় আর্থিক সিদ্ধান্ত কেবল মন্ত্রিসভার মাধ্যমেই নেওয়া সম্ভব বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো উল্লেখ করেছে। দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিগত এক দশকে নানা উত্থান-পতন দেখা গেলেও তেল ও পানির সম্পদের বিষয়গুলো সবসময়ই দুই দেশের শীর্ষ অগ্রাধিকার তালিকায় ছিল। বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে নতুন তেল পাইপলাইন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তা উভয় দেশের জন্যই অর্থনৈতিক স্বস্তি বয়ে আনতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
সফরকালে তুর্কি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে নিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক সন্ত্রাস দমন এবং যৌথ সীমান্ত সুরক্ষার ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ওপর জোর দেওয়া হতে পারে। এছাড়া দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক লেনদেন বৃদ্ধি এবং অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন সংক্রান্ত দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের উপায় নিয়ে উভয় পক্ষের শীর্ষ নেতারা মতবিনিময় করবেন।
বিশেষ করে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করার দীর্ঘদিনের দাবি জানিয়েছে আসছে বাগদাদ। তুর্কি সরকারের সঙ্গে চলমান এই উচ্চপর্যায়ী বৈঠকে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত সুরক্ষার বিষয়টিতেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দুই দেশের নেতারা পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ বজায় রেখে অমীমাংসিত বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন।
তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় আয়োজিত এই বৈঠকে ইরাকি প্রতিনিধিদলে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার করার এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলাফল কী দাঁড়ায়, সেদিকে এখন বিশ্ববাসীর নজর রয়েছে। নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী সফর শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
