বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ২৯, ২০২৬, ০৭:২১ পিএম

মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অঙ্গনে চলমান তীব্র সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ সামরিক অভিযান এবং জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম একলাফে প্রায় পাঁচ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং আল জাজিরার প্রতিবেদনে প্রকাশ যে এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে গভীর সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত কয়েক মাস ধরে চলা অস্থিরতার মাঝে এই নতুন উত্তেজনায় বিশ্ববাজার আবারও চরম অস্থিতিশীলতার মুখে পড়েছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম একলাফে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি নির্ধারিত সীমার অনেক ওপরে পৌঁছে গেছে, যা গত মে মাসের পর সর্বোচ্চ রেকর্ড। একই সঙ্গে মার্কিন বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দামও দ্রুতগতিতে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এর আগে গত শনিবার থেকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সীমিত পর্যায়ে পাল্টাপাল্টি হামলা বন্ধ থাকার কারণে তেলের দাম কিছুটা নিম্নমুখী হয়েছিল এবং বাজারে স্বস্তির ভাব ফিরে আসছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনার বিস্ফোরণ ঘটায় সেই স্বস্তি মুহূর্তেই উবে গেছে।

পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ ধারণ করেছে যখন ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর বা আইআরজিসি মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। দেশটির পক্ষ থেকে এটিকে একটি বড় ধরনের কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি তেল পরিকাঠামোতে ড্রোন হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর যৌথ বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি সামরিক বাহিনী। এই পারস্পরিক আক্রমণের ফলে পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের পরিধি আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর।

বাজার বিশ্লেষক এবং অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন যে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই মূলত এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের একটি বিশাল অংশ এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় যেকোনো ছোট সামরিক সংঘাতও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের দামের ওঠানামা তৈরি করে। ইউবিএস-এর বিশ্লেষক জিওভানি স্টাউনোভোর মতে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক হামলা এবং জ্বালানি প্রবাহে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনাই তেলের বাজারকে পুনরায় অস্থির করে তুলেছে। এর পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী কর্তৃক লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলছে।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এই জ্বালানি সংকট এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে যদি এই সংঘাত অব্যাহত থাকে, তবে উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় দেশের জন্যই মুদ্রাসফীতি বৃদ্ধির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। আন্তর্জাতিক বাজার বিশেষজ্ঞরা পূর্বাভাস দিয়েছেন যে বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে নিকট ভবিষ্যতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলে নির্ধারিত উচ্চ সীমার মধ্যেই ওঠানামা করতে পারে। কূটনৈতিক উপায়ে এই সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতি এক গভীর মন্দার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গভীরভাবে উদ্বেগের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনার প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছে। তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বড় অর্থনীতির দেশগুলো কী ধরনের কৌশল গ্রহণ করে এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। যুদ্ধের দামামা এবং বাণিজ্যিক অস্থিরতার এই চক্র থেকে বিশ্ব অর্থনীতি কবে মুক্তি পাবে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর এই মুহূর্তে কারো কাছে নেই। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট যে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ সরাসরি স্পর্শ করছে সারা বিশ্বের প্রতিটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে।

banner
Link copied!