বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়ায় অর্ধলক্ষ দেউলিয়া

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ৮, ২০২৬, ০৯:২৬ পিএম

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়ায় অর্ধলক্ষ দেউলিয়া

ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াবহ প্রভাবে গত বছর রাশিয়ায় পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষ দেউলিয়া ঘোষিত হয়েছেন। ইউরোপীয় গোয়েন্দা সংস্থার এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো যুদ্ধের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। যুদ্ধের চতুর্থ বছরে পদার্পণকারী রাশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস চলতি বছরের জন্য শূন্য দশমিক চার শতাংশে নামিয়ে এনেছে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়। মূলত সামরিক খাতে সরকারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়ের কারণেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় এই চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

গোপন এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, রাশিয়ার সরকার ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করছে এবং এর ফলে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। রুশ ব্যাংকগুলো গত কয়েক বছরে প্রচুর পরিমাণে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ প্রদান করেছে, যা এখন অর্থনীতির জন্য বড় সংকট হিসেবে দেখা দিচ্ছে। প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, পশ্চিমা দেশগুলোর দেওয়া নতুন নিষেধাজ্ঞার প্যাকেজ, যা জুলাই মাস নাগাদ চূড়ান্ত হতে পারে, তা রাশিয়ার ব্যাংকিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সি নেটওয়ার্ককে আরও বিপাকে ফেলবে।

ব্যাংকিং খাতের এই অস্থিরতা নিয়ে অবশ্য ভিন্ন মতও রয়েছে। চ্যাথাম হাউসের বিশেষজ্ঞ ভ্লাদিস্লাভ ইনোজেমেতসেভ মনে করেন, দেশটিতে বড় ধরনের কোনো ব্যাংকিং ধস ঘটার সম্ভাবনা কম। তার মতে, বড় ব্যাংকগুলোর ওপর সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যাপ্ত রিজার্ভ পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল রাখছে। তবে এটি অস্বীকার করার উপায় নেই যে, কর্পোরেট ঋণগুলোর দশ শতাংশ এখন খেলাপি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা দুই বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি।

বর্তমানে রাশিয়ার কর্পোরেট ঋণের পরিমাণ সাত ট্রিলিয়ন রুবল, যা তাদের মোট জিডিপির তিন শতাংশ। এর বড় অংশই প্রতিরক্ষা খাতের সাথে যুক্ত কোম্পানিগুলোর। ইনোজেমেতসেভ উল্লেখ করেছেন, এই ঋণগুলো শেষ পর্যন্ত সরকারকেই শোধ করতে হবে অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় তারল্য সরবরাহ করবে। ব্যক্তিগত ঋণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। প্রায় তেরো লাখ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে একাধিক ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করেছেন, যা বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দায় তাদের দেউলিয়া হওয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

যুদ্ধকালীন অর্থনীতি রাশিয়ার সামগ্রিক কাঠামো বদলে দিয়েছে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও তেল রপ্তানিতে বাধার কারণে রাশিয়ার অর্থনীতি এখন অনেক বেশি অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ওপর নির্ভরশীল। রাশিয়ার জ্বালানি খাত ইউক্রেনের ড্রোনের ধারাবাহিক হামলার শিকার হওয়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। গ্যালাপের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, রাশিয়ার প্রায় ষাট শতাংশ মানুষ মনে করেন যে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটছে, যা বিগত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।

রাশিয়ার ব্যাংকিং খাতের বর্তমান মুনাফা রেকর্ডের দিকে থাকলেও, সাধারণ মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার মান নিম্নমুখী। ইনোজেমেতসেভের ভাষায়, রাশিয়ার অর্থনীতি এখন বহির্বিশ্ব থেকে অনেক বেশি বিচ্ছিন্ন এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে গিয়ে তারা দীর্ঘমেয়াদী সংকটের মুখে পড়েছে। রাশিয়ার পুঁজিবাজার এখন আর বৈশ্বিক অস্থিরতায় তেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় না, কারণ এটি অনেক বেশি বন্ধ হয়ে গেছে।

নিষেধাজ্ঞার ফলে রাশিয়ার ব্যাংকগুলো ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছে, যা আন্তর্জাতিক নজরদারিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলো সতর্ক করছে যে, যদি অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নতুন কোনো বড় ধরনের ধাক্কা আসে, তবে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য ভেঙে পড়তে পারে। যদিও বর্তমান কর্তৃপক্ষ সংকটকে বড় করে দেখতে নারাজ, তবুও সাধারণ মানুষের ঋণের বোঝা ও ছোট ব্যাংকগুলোর ঝুঁকির কথা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। রাশিয়ার এই অর্থনৈতিক পরীক্ষা কেবল যুদ্ধের ফলাফলের ওপরই নয়, বরং দেশটির অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

banner
Link copied!