গাজায় দুই দশক ধরে চলা হামাসের প্রশাসনিক শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটেছে। দীর্ঘমেয়াদী অবরোধ, রাজনৈতিক বিভাজন এবং ভয়াবহ সামরিক সংঘাতের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত এই দুই দশকের পর, হামাস তাদের সরকারি জরুরি কমিটি বিলুপ্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। এই পরিবর্তনের মাধ্যমে উপত্যকার প্রশাসনিক দায়িত্ব এখন আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্রযুক্তিবিদ নির্ভর কমিটির হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। গাজার জন্য গঠিত এই নতুন জাতীয় কমিটির নাম দেওয়া হয়েছে ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফ গাজা, যা মূলত গাজা পিস কাউন্সিলের তত্ত্বাবধানে কাজ করবে।
হামাসের শাসনের এই যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালের ২৬ জানুয়ারি। সে সময় ফিলিস্তিনের সংসদীয় নির্বাচনে হামাস অপ্রত্যাশিতভাবে বিশাল বিজয় অর্জন করে। মোট একশ বত্রিশটি আসনের মধ্যে ছিয়াত্তরটি আসনই তারা নিজেদের দখলে নিয়েছিল, যা তৎকালীন ফাতাহ আন্দোলনের দীর্ঘ আধিপত্যকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল। নির্বাচনের এই ফলাফল পশ্চিমাবিশ্বের জন্য ছিল চরম বিস্ময়কর। যদিও অধিকাংশ পর্যবেক্ষক নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি, তবুও রাজনৈতিক আদর্শের অমিলের কারণে পশ্চিমা শক্তিগুলো এই গণতান্ত্রিক ফলাফলকে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়।
ফলাফল প্রকাশের কয়েক মাসের মধ্যেই ইসরায়েল গাজার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অবরোধ আরোপ করে। গাজার অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর এই অবরোধ এক ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছিল। পরবর্তীতে ২০০৭ সালের ১৪ জুন অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কোন্দলের জের ধরে হামাস গাজার পূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এই ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ঐক্যমত্যের সরকার ভেঙে দেন এবং ইসরায়েল গাজার ওপর ভূমি, সমুদ্র ও আকাশপথে সর্বাত্মক অবরোধ কার্যকর করে। এরপর থেকে গাজার প্রায় আশি শতাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে যায় এবং বেকারত্বের হার আকাশচুম্বী হয়।
দীর্ঘ এই সময়ে হামাস বারবার তাদের প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের চেষ্টা করেছে। ২০১৪ সালে ঐক্যমত্যের চুক্তির ব্যর্থতার পর তারা একটি প্রশাসনিক কমিটি গঠন করেছিল। ২০১৭ সালে মিসরের চাপে তারা সেই কমিটি বিলুপ্ত করে, যাতে একটি ঐক্যবদ্ধ সরকার গঠিত হতে পারে। গবেষক মোহাম্মদ আল-আইলা জানান, হামাসের এই ক্ষমতা হস্তান্তরের ইচ্ছা কেবল বর্তমান যুদ্ধের কারণে নয়, বরং তারা অনেক আগে থেকেই জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিল। এর প্রমাণ হিসেবে ২০২১ সালে আব্বাস কর্তৃক সাধারণ নির্বাচন বাতিল এবং ২০২২ সালে আলজিয়ার্সে স্বাক্ষরিত চুক্তির কথা উল্লেখ করা যায়।
২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে শুরু হওয়া যুদ্ধ হামাসের শাসনব্যবস্থাকে আমূল বদলে দেয়। যুদ্ধের শুরুর দিকে তারা জরুরি সরকার কমিটি গঠন করে হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র এবং ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব পালন করে। তবে ইসরায়েলের পরিকল্পিত হামলায় গাজার প্রশাসনিক কাঠামো চরম হুমকির মুখে পড়ে। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে প্রশাসনিক কমিটির প্রধান ইসাম আল-দায়েলিসের মৃত্যু গাজার স্থানীয় শাসনব্যবস্থায় এক বড় শূন্যতা তৈরি করে। আল-আইলার মতে, ইসরায়েলের এই কৌশল ছিল প্রশাসনিক অচলবস্থা তৈরি করা, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া বিকল্প কোনো শাসনব্যবস্থা গাজায় সহজে প্রতিষ্ঠা করা যায়।
২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে হোয়াইট হাউসের অনুমোদনে গাজায় একটি উত্তরণকালীন প্রশাসন কাঠামোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। আলী শাআথের নেতৃত্বে গঠিত এই জাতীয় কমিটি এখন গাজার যাবতীয় বেসামরিক সেবার দায়িত্ব পালন করছে। যদিও ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার এই পরিবর্তনকে লেবাননের হিজবুল্লাহ মডেলের সঙ্গে তুলনা করে সংশয় প্রকাশ করেছেন, তবুও বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা খাতে প্রায় পঁয়তাল্লিশ হাজার বিদ্যমান সরকারি কর্মী তাদের দায়িত্ব পালন চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই বিশাল আমলাতান্ত্রিক জনবলকে সরিয়ে দেওয়া বা নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হবে গাজার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। আল-আইলা সতর্ক করে বলেন, অভিজ্ঞ কর্মীদের বাদ দিলে তা প্রাতিষ্ঠানিক পঙ্গুত্ব ডেকে আনতে পারে। জাতীয় কমিটির সাফল্য নির্ভর করবে তারা গাজার বিদ্যমান রাজনৈতিক শক্তি ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে কতটা সমন্বয় বজায় রাখতে পারবে তার ওপর। দীর্ঘ বিশ বছরের শাসনকালের ইতি টেনে গাজা এখন এক নতুন রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যার ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
