বুধবার, ০৮ জুলাই, ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩

যুক্তরাজ্যে এডিএইচডি আক্রান্তদের ভাতার আবেদন বাড়ছে কেন?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ৮, ২০২৬, ০৯:১৬ পিএম

যুক্তরাজ্যে এডিএইচডি আক্রান্তদের ভাতার আবেদন বাড়ছে কেন?

যুক্তরাজ্যে সম্প্রতি প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আগের তুলনায় অনেক বেশি তরুণ এডিএইচডি বা অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হওয়ার পর সরকারি ভাতার জন্য আবেদন করছেন। দেশটির সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবি উঠার মধ্যেই এমন চিত্র উঠে এলো। জুলাই ২০২৪ থেকে এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ভাতা বা পিআইপি গ্রহণকারীদের অন্তত চল্লিশ শতাংশই কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত।

বিশেষ করে এডিএইচডি-র কারণে কর্মবিমুখ হয়ে ভাতা গ্রহণকারীর সংখ্যা জুলাই ২০২৪-এর ৭১ হাজার ৫২৮ জন থেকে বেড়ে এই বছরের এপ্রিলে এক লাখ দুই হাজার ২০৭ জনে দাঁড়িয়েছে। মূলত ষোলো থেকে চব্বিশ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। দ্য টাইমস পত্রিকার প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে। কনজারভেটিভ পার্টির নেতা কেমি বেডেনক দাবি করেছেন যে, মৃদু মানসিক সমস্যার জন্য সরকারি ভাতা দেওয়া বন্ধ করা উচিত। তবে তার এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মেন্ডি পোলোমি মনে করেন, তরুণদের এডিএইচডি ও ভাতা গ্রহণ নিয়ে বর্তমান বিতর্কটি বিভ্রান্তিকর। তার মতে, সামাজিক নিরাপত্তার এই অর্থ পুনরায় দেশের অর্থনীতির সঞ্চালনে ভূমিকা রাখে। মানুষ এই অর্থ দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনেন এবং বিভিন্ন সেবার বিল পরিশোধ করেন। ফলে এই টাকা সমাজেই সার্কুলেট করে, যা অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে সাহায্য করে। এছাড়া ভাতা পাওয়া মানেই যে কেউ কাজ করতে অক্ষম, এমনটি নয়। পিআইপি প্রাপ্তির জন্য জটিল মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

এডিএইচডি হলো এমন একটি মানসিক অবস্থা, যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন না, তাদের মধ্যে অতি চঞ্চলতা ও আবেগপ্রবণতা দেখা দেয়। সাধারণত বারো বছর বয়সের আগে এর লক্ষণগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে। নারীদের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি অনেক সময় সঠিক সময়ে শনাক্ত করা হয় না। যুক্তরাজ্যের এনএইচএস-এর তথ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ডে প্রায় চব্বিশ লাখ মানুষ এডিএইচডিতে আক্রান্ত, যার মধ্যে সাত লাখ একচল্লিশ হাজার মানুষের বয়স পাঁচ থেকে চব্বিশ বছরের মধ্যে।

সঠিকভাবে রোগ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য বর্তমানে এক ধরনের সংকটের মুখে রয়েছে। সাধারণ চিকিৎসকের কাছে রেফারেল পাওয়ার পর একজন বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছাতে অনেক ক্ষেত্রে মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। কোনো কোনো এলাকায় অপেক্ষমাণ তালিকা এতটাই দীর্ঘ যে সেখানে নতুন করে আর কোনো রোগীর নাম নথিভুক্ত করা হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞের মতে, যুক্তরাজ্য এখন আন্ডারডায়াগনোসিস বা রোগ শনাক্তকরণের ঘাটতির মতো বড় সংকটে ভুগছে।

প্রতিবন্ধী ভাতার জন্য কেবল রোগ শনাক্ত থাকলেই হয় না, এর জন্য কঠোর মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য সরকার প্রায় ৭৭ বিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে এডিএইচডির জন্য ঠিক কত টাকা ব্যয় হচ্ছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। প্রতিবন্ধী কল্যাণ ব্যবস্থার ওপর স্টিফেন টিমস একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন প্রকাশ করতে চলেছেন, যা আগামী দিনে এই খাতের রূপরেখা বদলে দিতে পারে।

পরিশেষে, বর্তমান কল্যাণ ব্যবস্থাটি মানবিক কি না এবং তা মানুষকে কাজে উৎসাহিত করছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, এডিএইচডি আক্রান্ত তরুণরা সমাজ ও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে ইচ্ছুক। তাদের এই অদম্য ইচ্ছাকে কাজে লাগাতে উপযুক্ত পরিবেশ ও সহযোগিতা প্রয়োজন। ভাতার পেছনে ঢালাও ব্যয় সংকোচনের পরিবর্তে মানুষের সক্ষমতাকে কাজে লাগানোর কৌশলী পরিকল্পনা এই সমস্যার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান দিতে পারে।

banner
Link copied!