বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফা এবং এর সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নতুন এক বাণিজ্যিক প্রস্তাব নিয়ে চরম বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছেন। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস এবং আল জাজিরার প্রতিবেদনে প্রকাশ যে ফিফার ভবিষ্যৎ বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টগুলোর অংশবিশেষ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দুইশো এগারোটি সদস্য ফেডারেশনকে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে ফিফা একটি বিশাল বাণিজ্যিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, যার একটি বড় অংশ মার্কিন বিনিয়োগকারী মহলের নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।
ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনো তার সদ্য প্রেরিত চিঠিতে এই প্রস্তাবকে একটি অভিনব সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী দুই হাজার কোটি ডলারের একটি সাবসিডিয়ারি বা সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনের কথা বলা হয়েছে, যার বিশ শতাংশ মালিকানা থাকবে বাইরের বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে। এই নতুন বাণিজ্যিক কাঠামোর মাধ্যমে পুরুষ ও নারী বিশ্বকাপ এবং ক্লাব বিশ্বকাপের মতো বড় আসরগুলো পরিচালিত হবে। তবে এই পদক্ষেপে ফুটবলের মূল কাঠামো ও ঐতিহ্য মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন সমালোচকরা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জারেড কুশনারের ভাইয়ের প্রতিষ্ঠিত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম থ্রাইভ ক্যাপিটাল এই বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার মূল পৃষ্ঠপোষক হিসেবে যুক্ত রয়েছে। এই ব্যবসায়িক চুক্তির নেপথ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন উয়েফা এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। উয়েফার মতে, বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট কোনো বিক্রয়যোগ্য পণ্য নয় এবং ফিফার একাই এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো অধিকার নেই।
পরিস্থিতি সামাল দিতে উয়েফা খুব দ্রুতই তাদের পঞ্চান্নটি সদস্য ফেডারেশনকে নিয়ে একটি জরুরি অনলাইন সভার আয়োজন করতে চলেছে। ইউরোপীয় ফুটবল মহলের পাশাপাশি এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন এবং উত্তর ও মধ্য আমেরিকা অঞ্চলের কনফেডারেশন কনকাকাফও এই আকস্মিক পদক্ষেপে গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। কোনো ধরনের পূর্ব আলোচনা বা স্বচ্ছতা ছাড়া এই ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করায় বিশ্ব ফুটবলের মূল স্তম্ভগুলোই আজ প্রশ্নের মুখে পড়েছে। কনকাকাফের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে যথাযথ নিয়ম ও প্রক্রিয়া লঙ্ঘন করে এই প্রস্তাব সামনে আনা হয়েছে, যা চরম হতাশার জন্ম দিয়েছে।
প্রস্তাবিত এই বাণিজ্যিক চুক্তির পক্ষে সাফাই গেয়ে ইনফান্তিনো জানিয়েছেন যে পরিকল্পনাটি অনুমোদিত হলে প্রতিটি সদস্য ফেডারেশন চার বছরের বাণিজ্যিক চক্র থেকে দুই কোটি ডলার পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা পেতে পারে। এই পুরো প্রক্রিয়াটির দেখভাল করার জন্য জেপি মরগানের মতো বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হলে সদস্য দেশগুলো তাদের পূর্বনির্ধারিত এক কোটি ডলারই পাবে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে সদস্য দেশগুলোকে এই চুক্তির পক্ষে টানার চেষ্টা চলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক মহিলেও এই নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রীও ফিফার এই বাণিজ্যিক পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে, ফুটবল কোনো কর্পোরেট পণ্য নয়, এটি স্টেডিয়ামে উপস্থিত সাধারণ দর্শকদের আবেগ এবং তাদের দীর্ঘদিনের ভালোবাসার প্রতীক। অতীতে ইউরোপীয় সুপার লিগ গঠনের সময় যেভাবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়া হয়েছিল, বর্তমানের এই পরিস্থিতিতেও তেমনি গণরোষ তৈরি হয়েছে। বিশ্ব ফুটবলের ভবিষ্যৎ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং ক্রীড়ার মৌলিক আদর্শ মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সদস্য দেশগুলো এই প্রস্তাব গ্রহণ করে কি না, সেটাই এখন দেখার মূল বিষয়।
