মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই সংঘাতকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও সহজ একটি বিষয় হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন বলে নতুন তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের নীতিনির্ধারকরা বিশ্বাস করতেন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান খুব দ্রুত একটি নির্দিষ্ট ফলাফলের দিকে পৌঁছাবে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে রূপ নেওয়া এই যুদ্ধের বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জটিলতার জন্ম দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর অনুসন্ধানে এই চাঞ্চল্যকর কূটনৈতিক ও সামরিক হিসাব-নিকাশের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশিষ্ট সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যানের তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের বিভিন্ন রূপরেখা বা দৃশ্যপট তুলে ধরেছিলেন। অন্যদিকে মার্কিন রাজনৈতিক মহলের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা এই সংঘাত কেবল কয়েক সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে বলে ধারণা করেছিলেন। দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের এই প্রাথমিক পরিকল্পনা ও অনুমানের ওপর ভিত্তি করেই মূলত সামরিক পদক্ষেপগুলো পরিচালিত হয়েছিল। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতি এবং ইরানের তরফ থেকে আসা প্রতিরোধ সেই ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে।
দীর্ঘমেয়াদি কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই এই সামরিক অভিযান শুরু করায় বর্তমানে গোটা অঞ্চলে এক গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধের পরিধি কেবল নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ক্রমান্বয়ে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। মার্কিন ও ইসরায়েলি প্রশাসনের ভেতরের এই অবাস্তব প্রত্যাশা নিয়ে বিভিন্ন মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। কূটনীতির টেবিল ছেড়ে সরাসরি অস্ত্রের ভাষায় সমস্যার সমাধানের যে পথ তারা বেছে নিয়েছিল, তার পরিণতি এখন পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যেকোনো দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আগাম ভুল অনুমান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতিকে চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেয়। ইরানের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ধরনের ভুল হিসাব করা হয়েছিল বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। শাসক পরিবর্তনের সহজ সমীকরণ ধরে এগোলেও অভ্যন্তরীণ প্রতিরোধ এবং আঞ্চলিক সমীকরণের কারণে সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। বরং এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, যা সহজে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতৃত্বের কৌশলগত এই ত্রুটি নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মহলেও বিতর্ক শুরু হয়েছে। যুদ্ধের নানামুখী নেতিবাচক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে নীতিনির্ধারকরা এখন নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে বাধ্য হচ্ছেন। কূটনীতির মাধ্যমে এই সংকটের সুরাহা করার পথগুলো দিন দিন আরও সংকুচিত হয়ে আসছে। বিশ্ববাসীর এখন একটাই প্রশ্ন, এই দীর্ঘ সংঘাতের শেষ কোথায় এবং কবে নাগাদ এই আঞ্চলিক অস্থিরতার অবসান ঘটবে।
পরিশেষে বলা যায়, ক্ষমতার অহমিকা ও দ্রুত জয়ের অন্ধ মোহই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মুখে ফেলেছে। গোয়েন্দা তথ্য ও রাজনৈতিক অনুমানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, সাম্প্রতিক এই ঘটনা তারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ। আগামী দিনে এই সংঘাত কোন নতুন মোড় নেয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কীভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে, সেটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার বিষয়।
