সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহাসিক সাঈদা জয়নব এলাকায় দীর্ঘ দশকের গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরেও পুরোপুরি কাটেনি ভীতি ও শঙ্কা। আল জাজিরা এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে প্রকাশ যে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর ওই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ এক সতর্ক শান্তির মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর দৌহিত্রী এবং চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর কন্যা হযরত জয়নব (রা.)-এর পবিত্র মাজারের জন্য বিশ্বজুড়ে খ্যাত এই এলাকাটি অতীতে তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের পদচারণায় মুখর থাকত। কিন্তু সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই চিরচেনা রূপ আর আগের মতো নেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা উন্নত হলেও সাধারণ মানুষের মনের গভীরে এখনও চাপা আতঙ্ক কাজ করছে। মোহাম্মদ সালৌতা নামের এলাকার এক স্থানীয় ব্যবসায়ী জানিয়েছেন যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের মনে শতভাগ আস্থা এখনো ফিরে আসেনি। আসাদ সরকারের আমলে ইরাকসহ বিভিন্ন দেশ থেকে শিয়া ধর্মীয় পর্যটক ও দর্শনার্থীরা দলবেঁধে এই পবিত্র মাজার জিয়ারত করতে আসতেন। তাদের উপস্থিতির কারণে স্থানীয় হোটেল, রেস্তোরাঁ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ জমজমাট ছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে সেই পর্যটন শিল্প প্রায় মুখ থুবড়ে পড়েছে।
যদিও ওমান, বাহরাইন ও কুয়েতের কিছু পর্যটক মাঝেমধ্যে এই এলাকা দিয়ে যাতায়াত করেন, তবে ইরাকি তীর্থযাত্রীদের উপস্থিতি এখন প্রায় নেই বললেই চলে। নিরাপত্তার প্রশ্নটি কেবল পর্যটনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা স্থানীয় জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলেছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সাঈদা জয়নব এলাকাকে টার্গেট করে আইএসআইএসের একাধিক হামলা ও নাশকতার পরিকল্পনা নস্যাৎ করেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্টের সাম্প্রতিক দামেস্ক সফরের সময় বোমা হামলার পরিকল্পনা করা একটি গোপন সেলের সদস্যদেরও নিরাপত্তা বাহিনী সফলভাবে গ্রেপ্তার করেছে।
তা সত্ত্বেও সন্ত্রাসী হুমকি পুরোপুরি দূর হয়নি। গত মে মাসে ফরহান হাসান আল-মানসুর নামের এক স্থানীয় শিয়া ধর্মীয় নেতাকে তার গাড়িতে বোমা হামলা চালিয়ে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছিল উগ্রপন্থী গোষ্ঠী আইএসআইএস। এই ধরনের বিচ্ছিন্ন হামলা ও সহিংসতার ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে দামেস্কের কেন্দ্রস্থলের বাইরে অবস্থিত অঞ্চলগুলোতে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখনো এক বড় চ্যালেঞ্জ। নতুন প্রশাসনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
সিরিয়ার বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক সমর্থন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার মাধ্যমে তারা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনীতি ও পরিকাঠামো পুনর্গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে দশকের পর দশক ধরে চলা sectarian বা সম্প্রদায়গত সংঘাতের ক্ষত সহজে মুছে যাওয়ার নয়। স্থানীয় সাধারণ মানুষ কেবল শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে চায়, যেখানে তারা অতীতের ভয়াবহতা পেছনে ফেলে ভবিষ্যতের সোনালী দিনের স্বপ্ন দেখতে পারে।
সামগ্রik এই পরিস্থিতিতে সাঈদা জয়নব এলাকার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে সরকারের সামগ্রিক নিরাপত্তা নীতির সফল বাস্তবায়নের ওপর। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে সিরিয়ার নতুন নেতৃত্ব যদি দেশের প্রতিটি কোনায় সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তবেই কেবল প্রকৃত শান্তি ফিরে আসবে। অন্যথায় এই ধরনের চাপা উত্তেজনা ও ভীতি যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের সংকটের রূপ নিতে পারে। বিশ্ববাসীর নজর এখন দামেস্কের পরবর্তী পদক্ষেপগুলোর দিকেই নিবদ্ধ রয়েছে।
