বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট, ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

মানুষের শহরে টিকতে অতি দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছে প্রাণীরা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ৬, ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম

মানুষের শহরে টিকতে অতি দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছে প্রাণীরা

মানুষের সৃষ্ট জটিল পরিবেশ, দ্রুত নগরায়ণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন বন্যপ্রাণী অত্যন্ত দ্রুতগতিতে নিজেদের বিবর্তিত করছে বলে বিবিসি নিউজ জানিয়েছে। কংক্রিটের তৈরি শহরগুলোতে টিকে থাকার জন্য প্রাণীরা কেবল নিজেদের আচরণগত পরিবর্তনই আনছে না, বরং তাদের শারীরিক ও জন্মগত কাঠামোর রূপান্তরও ঘটছে। বিজ্ঞানীরা প্রাণীদের এই দ্রুত পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে সমসাময়িক বিবর্তন হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাদের মতে, মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রম বর্তমানে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান বিবর্তনীয় শক্তি হিসেবে কাজ করছে।

পুয়ের্তো রিকোর শহরগুলোতে বসবাসকারী অ্যানোল প্রজাতির টিকটিকির ক্ষেত্রে এই বিবর্তনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। প্রাকৃতিকভাবে বনে বসবাস করা টিকটিকির তুলনায় শহরের টিকটিকিগুলোর শারীরিক গঠন একেবারেই ভিন্ন। শহর এলাকার ভবনে ওঠার জন্য এবং গরম পৃষ্ঠের ওপর দিয়ে দ্রুত দৌড়ানোর জন্য তাদের হাত ও পা উল্লেখযোগ্য হারে বড় হচ্ছে। পাশাপাশি মসৃণ পৃষ্ঠ আঁকড়ে ধরার জন্য তাদের পায়ের পাতার আঁশগুলো আরও বেশি বিকশিত হচ্ছে। গবেষকদের মতে, কাঁচ এবং ধাতব পদার্থের মতো মসৃণ কাঠামোর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর এই পরিবর্তনগুলো মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভিস ক্যাম্পাসের গবেষক অ্যান্ড্রু সিহ জানান, শহর অঞ্চলের কিছু প্রাণী নতুন এই পরিবেশের সঙ্গে অত্যন্ত চমৎকারভাবে মানিয়ে নিচ্ছে।

নির্দিষ্ট পরিবেশে টিকে থাকার জন্য প্রাণীদের এই পরিবর্তনগুলো সাধারণত কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই পরিষ্কারভাবে দৃশ্যমান হয়। যুক্তরাজ্যের শহরগুলোতে বসবাসকারী লাল রঙের শিয়ালের প্রজনন হার গ্রামীণ এলাকার শিয়ালগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এর মূল কারণ হলো, শহরাঞ্চলে তারা খুব সহজেই প্রচুর পরিমাণ খাবারের সন্ধান পায়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে থাকা র্যাকুনগুলোর শারীরিক কাঠামোতেও বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের র্যাকুনগুলোর নাক তুলনামূলকভাবে ছোট হয়ে যাচ্ছে এবং মানুষের প্রতি তাদের আক্রমণাত্মক আচরণ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় হ্রাস পাচ্ছে, যা মূলত তাদের গৃহপালিত হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ। পাশাপাশি ডেনমার্কে শহরের পরিবেশে বসবাস করা খরগোশগুলো মানুষের উপস্থিতিতে এখন আর আগের মতো ভীত হয় না, বরং তারা মানুষের প্রতি আরও বেশি সহনশীল হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের দূষণ এবং উচ্চ তাপমাত্রার মধ্যে থাকা প্রাণীরা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রাণীদের তুলনায় অনেক বেশি প্রতিকূলতা সহ্য করার ক্ষমতা অর্জন করেছে।

আচরণের পরিবর্তনের মাধ্যমে বন্যপ্রাণীরা কীভাবে নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেয়, যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের আরমাডিলো তার একটি চমৎকার উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। শীতকালে যখন ওই অঞ্চলের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায়, তখন আরমাডিলোগুলো উষ্ণতা পেতে বড় পাকা রাস্তাগুলোর ঠিক পাশে চলে আসে। কারণ রাস্তার পিচ সূর্যের তাপ শোষণ করে তা ধরে রাখতে পারে। এছাড়া ডার্ক আইড জাংকো নামক এক প্রজাতির পাখি শহরের তীব্র শব্দদূষণ এবং মানুষের উপস্থিতির কারণে তাদের স্বভাব ও গানের ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, এই পাখিদের ডানা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ দূরত্বে ওড়ার পরিবর্তে শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ভবনগুলোর ফাঁক দিয়ে ওড়ার জন্যই এমন কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ৫০ বছরে উত্তর আমেরিকায় এই প্রজাতির প্রায় ১৬ কোটি ৮০ লাখ পাখি মারা গেছে। তাই দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়ার এই ক্ষমতাই তাদের ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মূল চাবিকাঠি।

শহরের সীমানা ছাড়িয়ে অন্যান্য প্রাকৃতিক পরিবেশেও প্রাণীদের এমন বিবর্তন সমানভাবে চোখে পড়ার মতো। বিবিসি নিউজের তথ্যানুযায়ী, চোরাশিকারিদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে বর্তমানে অনেক হাতির জন্ম হচ্ছে কোনো ধরনের দাঁত ছাড়াই। কারণ শিকারিরা মূলত বিশাল দাঁতের জন্যই হাতিগুলোকে হত্যা করে থাকে। ফলে যেসব হাতির দাঁত থাকে না, সেগুলো বেঁচে যায় এবং তাদের দাঁতহীন বৈশিষ্ট্য পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়। একইভাবে মানুষের ক্রমাগত মাছ শিকারের কারণে অনেক প্রজাতির মাছের আকার ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে আটলান্টিক মহাসাগরের কিলিফিশ বিষাক্ত শিল্প বর্জ্য এবং রাসায়নিক পদার্থ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে তাদের ত্বককে আরও বেশি পুরু করে তুলছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো, দ্রুত বদলাতে থাকা এই পরিবেশে যেসব প্রাণী নিজেদের মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত তাদের ভাগ্যে কী ঘটবে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, মানুষের কারণে পৃথিবীর পরিবেশ এত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে যে অনেক প্রাণী বিবর্তিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সময়টুকুও পাচ্ছে না।

banner
Link copied!