আল জাজিরা এবং রয়টার্স-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জার্মানির লাইপজিগ বা হালে বিমানবন্দরে বিস্ফোরক যুক্ত একটি ড্রোন উদ্ধারের পর উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে জার্মান কর্তৃপক্ষ। ইউক্রেনের একটি কার্গো বিমানের কাছাকাছি বিস্ফোরকবাহী এই ড্রোনটি পাওয়া যাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হয় এবং একাধিক ফ্লাইট স্থগিত করা হয়। ইউরোপের বিভিন্ন সরবরাহ কেন্দ্রে নাশকতার ক্রমবর্ধমান আশঙ্কার মধ্যেই অত্যন্ত স্পর্শকাতর এই ঘটনা ঘটল।
মঙ্গলবার মধ্যরাতের কিছু আগে বিমানবন্দরের একজন সাধারণ কর্মী দক্ষিণ রানওয়ের কাছে একটি সংরক্ষিত কার্গো বা পণ্য পরিবহন এলাকায় ড্রোনটি দেখতে পান। এরপর পুলিশ এবং জরুরি সেবার কর্মীরা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ওই ঘটনাস্থল ঘিরে ফেলেন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। ড্রোনটিতে থাকা বিস্ফোরকটি খুব কাছ থেকে পরীক্ষা করার জন্য একটি বিশেষ বোমা নিষ্ক্রিয়কারী রোবট মোতায়েন করা হয়। কারিগরি বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ড্রোনটি থেকে ডেটোনেটর বা বিস্ফোরক নিয়ন্ত্রক অংশটি আলাদা করতে সক্ষম হন। ফলে বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। জার্মান কর্তৃপক্ষ বিস্ফোরকের ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। তবে বিভিন্ন নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, এটি ওই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার জন্য একটি মারাত্মক হুমকি তৈরি করেছিল।
লাইপজিগ বিমানবন্দরটি ইউরোপের অন্যতম প্রধান লজিস্টিক বা পণ্য সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। পূর্ব ইউরোপ বিশেষ করে ইউক্রেনের জন্য সামরিক ও মানবিক সহায়তা পরিবহনের ক্ষেত্রে এই বিমানবন্দরটি নিয়মিত ব্যবহৃত হয়। একাধিক গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ড্রোনটি ইউক্রেনীয় এয়ারলাইনস-এর একটি বড় আন্তোনভ কার্গো বিমানের ঠিক পাশেই পাওয়া গিয়েছিল।
ড্রোন উদ্ধারের পর ওই বিমানবন্দরের সমস্ত বিমান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। যাত্রীবাহী বিমানসহ বেশ কয়েকটি ফ্লাইট অন্য বিমানবন্দরে অবতরণ করতে বাধ্য হয়। এই আকস্মিক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে আকাশসীমায় আরেকটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে। রানওয়ে পুরোপুরি বন্ধ থাকার কারণে একটি পণ্যবাহী বিমান সেখানে অবতরণ করতে ব্যর্থ হয় এবং পুনরায় আকাশে উড্ডয়নের চেষ্টা করে। ঠিক সেই মুহূর্তে বিমানটি দ্বিতীয় আরেকটি অজানা উড়ন্ত বস্তুর সঙ্গে সজোরে ধাক্কা খায়। পাইলট অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বিমানটিকে মূল গন্তব্য থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত হ্যানোভার বিমানবন্দরে নিরাপদে অবতরণ করান। সেখানে গভীর পরিদর্শনের পর বিমানের বাইরের অংশে সামান্য ক্ষতির চিহ্ন পাওয়া গেছে। তবে দ্বিতীয় বস্তুটিও কোনো ড্রোন ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এই অভাবনীয় ঘটনার তদন্তভার স্যাক্সনি প্রদেশের সরকারি কৌঁসুলিদের হাতে সরাসরি হস্তান্তর করা হয়েছে। এই কৌঁসুলিরা মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং চরমপন্থি অপরাধ নিয়ে গভীরভাবে কাজ করেন। এই বিশেষ পদক্ষেপের মাধ্যমে ঘটনাটির পেছনে বড় ধরনের জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কর্তৃপক্ষ এখনো সন্দেহভাজন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে শনাক্ত করতে পারেনি। তবে জার্মানি বেশ কয়েক মাস ধরেই বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের নাশকতা এবং সাইবার হামলার বিষয়ে বারবার কঠোর সতর্কতা জারি করে আসছে।
ঠিক ২ বছর আগে এই একই বিমানবন্দরে একটি পার্সেলের ভেতর আচমকা অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। পশ্চিমা নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দৃঢ় সন্দেহ ছিল যে, আন্তর্জাতিক মালবাহী নেটওয়ার্কগুলোতে হামলার একটি আগাম পরীক্ষা হিসেবে রুশ গোয়েন্দারা ওই চক্রান্ত করেছিল।
এত বড় নিরাপত্তা লঙ্ঘনের পরও জার্মানির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছে যে, বর্তমানে যাত্রী বা বিমানবন্দর কর্মীদের জন্য নতুন করে কোনো বাড়তি বিপদ নেই। ড্রোন উদ্ধারের প্রায় ২ ঘণ্টা পর উত্তরের রানওয়ে খুলে দেওয়া হয় এবং বুধবার সকাল থেকে যাত্রীবাহী ফ্লাইটগুলো স্বাভাবিকভাবে চলাচল শুরু করে। তবে দক্ষিণ রানওয়েটি পূর্বনির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে। এই ভয়ংকর বিস্ফোরক হামলার চেষ্টায় জড়িতদের খুঁজে বের করতে সাধারণ মানুষের কাছে যেকোনো ধরনের তথ্য চেয়ে বিনীত আবেদন জানিয়েছে পুলিশ।
