আল জাজিরা এবং দ্য হিল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দীর্ঘস্থায়ী ইরান যুদ্ধের কোনো আশু সমাপ্তি দেখতে না পেয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের ওপর ক্রমশ আস্থা হারাচ্ছে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান পার্টি। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল, তার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং কৌশলগত অচলাবস্থা নিয়ে ক্যাপিটল হিলে চরম হতাশা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পত্রিকা দ্য হিল-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সিনেটর থম টিলিস প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্ব নিয়ে গভীর সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, হেগসেথের ওপর তার আর কোনো আস্থা অবশিষ্ট নেই। টিলিস তাকে অগোছালো এবং বৃহৎ প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সম্পূর্ণ অদক্ষ বলে অভিযুক্ত করেন। তিনি বলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী চরম হীনম্মন্যতায় ভুগছেন এবং প্রতিটি ছোটখাটো বিষয়ে অতিরিক্ত খবরদারি করার চেষ্টা করেন।
সিনেটর টিলিস আরও উল্লেখ করেন যে, এই আস্থাহীনতার সংকট পেন্টাগনের ভেতরেও ছড়িয়ে পড়েছে। সামরিক কর্মকর্তাদের অভ্যন্তরীণ উদ্বেগগুলো খুব সহজেই ওয়াশিংটনের আইনপ্রণেতাদের কানে পৌঁছাচ্ছে। তবে রিপাবলিকান নেতাদের এই অসন্তোষের কারণ কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পদে ব্যাপক রদবদল নিয়েও দলে তীব্র বিভক্তি দেখা দিয়েছে।
সম্প্রতি জেনারেল ক্রিস্টোফার লেনেভকে মার্কিন সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ পদে মনোনয়ন দিয়ে হেগসেথ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ও নিজ দলের সদস্যদের মধ্যে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন। এই মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে সর্বসম্মত সমর্থনের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু আইওয়া অঙ্গরাজ্যের সিনেটর জনি আর্নস্টসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা এর তীব্র বিরোধিতা করেন। সমালোচকদের দাবি, গত এপ্রিলে জেনারেল র্যান্ডি জর্জকে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়াই বরখাস্ত করার পর যখন লেনেভকে ভারপ্রাপ্ত সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন তার যথেষ্ট অভিজ্ঞতার অভাব ছিল।
সিনেট আর্মড সার্ভিসেস কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর রজার উইকারও সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে লেনেভের মনোনয়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। গত বছর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন মাদক পাচারের অভিযোগে ক্যারিবীয় সাগরে ছোট নৌযানগুলোর ওপর সামরিক হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন, তখন উইকার এবং ডেমোক্র্যাট সিনেটর জ্যাক রিড এই পদক্ষেপের আইনি ভিত্তি নিয়ে হেগসেথের কাছে কৈফিয়ত চেয়েছিলেন। তারা প্রশাসনকে এমন সন্ত্রাসী ও মাদক পাচারকারী চক্রের একটি তালিকা দিতে বলেছিলেন যাদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী সামরিক শক্তি প্রয়োগের আইনি বৈধতা রয়েছে। কিন্তু প্রশাসন সেই তালিকা সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়।
প্রতিরক্ষা বাজেটের বিশাল অঙ্ক নিয়েও হেগসেথ ব্যাপক তদন্তের মুখে পড়েছেন। গত মে মাসে সিনেট অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস সাবকমিটি অন ডিফেন্স-এর প্রধান সিনেটর মিচ ম্যাককনেল ২০২৭ সালের জন্য পেন্টাগনের প্রস্তাবিত ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজেটের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশের কড়া সমালোচনা করেন। এর মধ্যে ইসরায়েলের আয়রন ডোম প্রযুক্তির আদলে তৈরি গোল্ডেন ডোম নামক একটি বহুমুখী ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অর্থায়ন নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
একটি প্যানেল শুনানিতে অংশ নিয়ে ম্যাককনেল জানান, এই বিশাল প্রতিরক্ষা বাজেটের একটি অংশ রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাস করানোর চেষ্টা করছে প্রশাসন। এর ফলে সাধারণ ৬০ ভোটের বদলে মাত্র ৫১টি ভোটের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই বিলটি সিনেটে পাস করানো সম্ভব হবে। এছাড়া ঐতিহ্যবাহী মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে, বিশেষ করে সামরিক জোট ন্যাটোর সঙ্গে সম্পর্ক অবনতির কারণেও তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেন। ম্যাককনেল সতর্ক করে বলেন, পুরোনো সামরিক মিত্রদের বিচ্ছিন্ন করার এই নীতি শেষ পর্যন্ত কেবল শত্রুদেরই স্বার্থ রক্ষা করবে এবং বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস করবে।
