বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট, ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩

ইরাকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি, সরকার বিপাকে

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ৫, ২০২৬, ১০:১১ পিএম

ইরাকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি, সরকার বিপাকে

আল জাজিরা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরাকে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব ধরনের অস্ত্র সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার যে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চরম রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের মুখে পড়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি। শক্তিশালী শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সরকারের এই নির্দেশ মানতে তীব্র অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগ বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়েছে।

সারায়া আল-সালাম, আসায়েব আহল আল-হক এবং কাতাইব আল-ইমাম আলীর মতো বেশ কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সরকারি বাহিনীর সঙ্গে একীভূত হতে সম্মত হলেও, সবচেয়ে বেশি অস্ত্রে সজ্জিত কিছু গোষ্ঠী সরাসরি এই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখা ইরাকি আধাসামরিক গোষ্ঠী কাতাইব হিজবুল্লাহ স্পষ্টভাবে সরকারের এই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তারা দাবি করেছে যে, তাদের হাতে থাকা এই অস্ত্রগুলো প্রতিরোধ যুদ্ধের হাতিয়ার এবং তারা এগুলো জমা দেওয়ার বদলে নিজেদের অস্ত্রভান্ডার আরও উন্নত করার ঘোষণা দিয়েছে।

একইভাবে প্রভাবশালী গোষ্ঠী হারাকাত আল-নুজাবা জানিয়েছে যে, সরকারের উচিত অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা, যেগুলো সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। তাদের মতে, চরম দুঃসময়ে যেসব যোদ্ধা ইরাক, এর পবিত্র স্থানসমূহ এবং দেশের মানুষকে রক্ষা করেছে, তাদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এই অস্ত্র সমর্পণ প্রক্রিয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক চাপ রয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই চাপ আরও তীব্র হয়েছে। পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্যও ইরাক সরকারের এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

ইরাকের রাষ্ট্রীয় বাজেটের ৯০ শতাংশেরও বেশি আসে তেল রাজস্ব থেকে। কিন্তু হরমোজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে গত মার্চ মাসে দেশটির তেল রপ্তানি দৈনিক ৩ দশমিক ৩ মিলিয়ন ব্যারেল থেকে ভয়াবহভাবে কমে মাত্র ছয় লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। এমন অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্রের মতো আচরণ করা এই গোষ্ঠীগুলোর কারণে খোদ ইরাক সরকারের অস্তিত্ব নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন অনেক পর্যবেক্ষক। মুস্তানসিরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক তালিব মোহাম্মদ করিম আল জাজিরাকে জানান, রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে সশস্ত্র দলগুলোকে টিকিয়ে রাখা সাংবিধানিক কাঠামোর সম্পূর্ণ পরিপন্থী। তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, যেসব গোষ্ঠী অস্ত্র জমা দিতে রাজি হয়েছে বলে বলা হচ্ছে, তার অনেকটাই হয়তো কেবল গণমাধ্যমকে দেখানোর জন্য করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাজিম আল-হাজ্জ মনে করেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহার বা বিদেশি হুমকির অজুহাত দেখিয়ে এখন আর অস্ত্র ধরে রাখার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, বর্তমানে সীমান্ত পেরিয়ে যেসব হামলা হচ্ছে, তার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই এবং ইরাকের ভেতরের অস্ত্র ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় হওয়া উচিত। আগামী মাসের সময়সীমা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে সরকারের সামনে বিকল্প পথ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওমর আল-নাসের এই পরিস্থিতিকে ইরাকের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি অস্তিত্ব রক্ষার সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, ক্ষমতাসীন স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কোয়ালিশনকে এখন যেকোনো একটি পথ বেছে নিতে হবে। হয় তাদের একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গঠন করতে হবে যেখানে সমস্ত অস্ত্র রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে থাকবে, নতুবা তাদের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক জরিমানার মুখে পড়তে হবে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার শেষ পর্যন্ত এই অস্ত্র সমর্পণের সময়সীমা ডিসেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে বাধ্য হতে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

ইসলামি জীবনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বৈধ কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে বিরোধ এড়িয়ে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দিয়েছেন (সূরা আল-হুজুরাত, ৪৯:৯)। রাষ্ট্রের ভেতরে ভিন্ন ভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি যে কেবল জাতীয় সংহতিকেই দুর্বল করে না, বরং পুরো সমাজকে চরম বিপদের দিকে ঠেলে দেয়, ইরাকের বর্তমান পরিস্থিতি তারই একটি স্পষ্ট প্রমাণ।

banner
Link copied!