দীর্ঘ নয় শতকেরও বেশি সময় পর ইংল্যান্ডে ফিরে আসছে প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক শিল্পকর্ম বেয়ো ট্যাপেস্ট্রি। এই প্রাচীন নিদর্শনে ইংল্যান্ডের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং ক্ষমতার রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের বিস্তারিত বিবরণ সুতোর বুননে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। লন্ডনের বিখ্যাত ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এটি প্রদর্শিত হবে বলে নিশ্চিত করেছে বিবিসি নিউজ। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে শুরু করে ১১ জুলাই ২০২৭ পর্যন্ত দর্শনার্থীরা এই দুর্লভ প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদটি নিজ চোখে দেখার সুযোগ পাবেন।
৭০ মিটার দীর্ঘ এই সুবিশাল কাপড়ের ওপর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে নরম্যানদের ইংল্যান্ড বিজয় এবং ১০৬৬ সালের ঐতিহাসিক হেস্টিংসের যুদ্ধের দৃশ্যপট তুলে ধরা হয়েছে। এখানে মূলত ইংল্যান্ডের সিংহাসন দখলের জন্য নরম্যান্ডির ডিউক উইলিয়াম দ্য কনকারার এবং রাজা হ্যারল্ডের মধ্যবর্তী এক ভয়ানক রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাতকে উপস্থাপন করা হয়েছে। হিস্ট্রিঅ্যাক্সট্রা ম্যাগাজিনের আধেয় পরিচালক এবং ইতিহাসবিদ ডক্টর ডেভিড মাসগ্রোভ এই ট্যাপেস্ট্রির পাঁচটি মূল দৃশ্য বিশ্লেষণ করে এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন।
প্রথম দৃশ্যে তৎকালীন ক্ষমতাধর আর্ল হ্যারল্ডকে একজন বীর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১০৬৪ বা ১০৬৫ সালের দিকে তাকে উত্তর ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে পাঠানো হয়েছিল। সেখানে উইলিয়াম তাকে অস্ত্র উপহার দিয়ে সম্মানিত করেন। তবে দ্বিতীয় দৃশ্যেই কাহিনির পটপরিবর্তন ঘটে। সেখানে হ্যারল্ডকে অত্যন্ত বিমর্ষ ও যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় দুটি পবিত্র বাক্সের ওপর হাত রেখে শপথ নিতে দেখা যায়। ধারণা করা হয়, তিনি পূর্ববর্তী রাজা এডওয়ার্ড দ্য কনফেসরের উত্তরসূরি হিসেবে উইলিয়ামের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিচ্ছিলেন। ডক্টর মাসগ্রোভের মতে, এই দৃশ্যটিতে হ্যারল্ডকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত দেখাচ্ছিল এবং এখান থেকেই তার চূড়ান্ত পতনের সূচনা হয়।
১০৬৬ সালের জানুয়ারি মাসে রাজা এডওয়ার্ডের মৃত্যুর পর হ্যারল্ড নিজের দেওয়া সেই শপথ ভঙ্গ করে নিজেই ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসেন। ট্যাপেস্ট্রির তৃতীয় দৃশ্যে তাকে একজন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ঠিক সেই সময়ে আকাশে হ্যালির ধূমকেতুর আবির্ভাব ঘটে, যা প্রতি ৭৫ বছর পর পর পৃথিবী থেকে দেখা যায়। এই ধূমকেতুকে বিশ্বাসঘাতকতার কারণে একটি চরম অশুভ সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। শিল্পকর্মে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়।
সিংহাসন পুনরুদ্ধারের জন্য উইলিয়াম এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে অগ্রসর হন এবং হেস্টিংসের ময়দানে দুই পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ শুরু হয়। ট্যাপেস্ট্রির সবচেয়ে বিখ্যাত দৃশ্যটিতে রাজা হ্যারল্ডকে চোখে তিরবিদ্ধ অবস্থায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখা যায়। তবে ডক্টর মাসগ্রোভ জানিয়েছেন যে, এই তিরবিদ্ধ হওয়ার দৃশ্যটি মূল শিল্পকর্মে ছিল নাকি উনিশ শতকের সংস্কার কাজের সময় নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে এখনো গভীর বিতর্ক রয়েছে। তবে হ্যারল্ডের মৃত্যু এবং তার সেনাবাহিনীর পরাজয় যে ইংল্যান্ডের ইতিহাসের গতিপথ চিরতরে বদলে দিয়েছিল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
ইসলামি জীবনব্যবস্থায় ক্ষমতার পালাবদল এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার ওপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। মানুষের ক্ষমতা যে কখনোই চিরস্থায়ী নয় এবং তা একমাত্র মহান স্রষ্টার ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল, সে বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, আপনি বলুন, হে আল্লাহ, সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, আপনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান করেন এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা ছিনিয়ে নেন (সূরা আল ইমরান, ৩:২৬)। বেয়ো ট্যাপেস্ট্রিতে ফুটে ওঠা বিশ্বাসঘাতকতা এবং এক পরাক্রমশালী রাজার এমন করুণ পতন সেই শাশ্বত বাণীরই এক জ্বলন্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ।
