মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট, ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

ভয়াবহ খরার কবলে ইউরোপ, শুকিয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ নদী

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ৪, ২০২৬, ১২:৪৫ এএম

ভয়াবহ খরার কবলে ইউরোপ, শুকিয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ নদী

ইউরোপ জুড়ে চলমান তীব্র দাবদাহের কারণে জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের বিভিন্ন অংশে রাইন নদীর পানির স্তর রেকর্ড পরিমাণ নিচে নেমে গেছে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজ ও রয়টার্স জানিয়েছে। গত সপ্তাহে পশ্চিম জার্মানির কোলন এবং নেদারল্যান্ডস সীমান্তে লোবিথ অঞ্চলে রাইন নদীর পানির স্তর পরিমাপ শুরু হওয়ার পর থেকে সর্বনিম্নে পৌঁছানোর খবর পাওয়া গেছে। কেবল রাইন নয়, ইউরোপের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদী যেমন দানিউব এবং ইতালির পো নদীর পানির স্তরও চরম মাত্রায় শুকিয়ে গেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ড্রাউট অবজারভেটরি জানিয়েছে, জুলাই মাসের মাঝামাঝি থেকে মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপে খরা পরিস্থিতি আরও গুরুতর আকার ধারণ করেছে। আগামী অন্তত এক সপ্তাহ এই তীব্র দাবদাহ অব্যাহত থাকতে পারে এবং মধ্য ও দক্ষিণ ইউরোপের অনেক দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জার্মানির লো ওয়াটার ইনফরমেশন সিস্টেম জানিয়েছে যে জুলাইয়ের শেষে রাইন নদীর ৪৪ শতাংশ এবং দানিউব নদীর ৭৮ শতাংশ পানি পরিমাপক স্টেশনে পানির স্তর অত্যন্ত নিচে নেমে যাওয়ার তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে। সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বতমালা থেকে শুরু হয়ে উত্তর সাগরে পতিত হওয়া রাইন নদী ইউরোপের অন্যতম ব্যস্ত নৌপথ। পানির স্তর কমে যাওয়ায় নৌ চলাচল এবং পণ্য পরিবহন সীমিত করতে হচ্ছে, যা ব্যাপক অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করেছে। কোবলেনজের কাছে কাউব পয়েন্টে নদীর নাব্যতার স্তর ২০১৮ সালের ২৫ সেন্টিমিটারের রেকর্ডে নেমে এসেছিল, যদিও পরে তা সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ইউরোপের পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি বিশাল অংশ রাইন নদীর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এখন গভীর সংকটের মুখে পড়েছে।

কাউব স্টেশনটি রাইন নদীর নাব্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে কাজ করে, কারণ এর মাধ্যমে কার্গো জাহাজগুলো কতটুকু ওজন বহন করতে পারবে তা নির্ধারণ করা হয়। রাইন ওয়াটারওয়েজ অ্যান্ড শিপিং অথরিটির কর্মকর্তা মার্টিন ভোল্টার্স জার্মান সংবাদমাধ্যম ডব্লিউডিআর-কে জানিয়েছেন, রাইন নদীতে নৌ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকলেও পণ্যবাহী জাহাজগুলোর ওজন কমাতে কার্গো একাধিক ছোট জাহাজে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। রয়টার্সের তথ্যমতে, একজন পণ্য ব্যবসায়ী জানিয়েছেন যে একসময় জাহাজের লোড এতই কম হয় যে তা আর লাভজনক থাকে না এবং মালিকরা নৌযানের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এর ফলে পণ্য পরিবহনের খরচ বৃদ্ধি পাবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের সংকট দেখা দেবে। বিকল্প পথে পণ্য পরিবহন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় ভারী শিল্পের কাঁচামাল পরিবহন কঠিন হয়ে পড়েছে।

অন্যদিকে দানিউব নদীর পানির স্তর গত ত্রিশ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছানোর কারণে সার্বিয়া ও রোমানিয়াসহ একাধিক দেশে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। পানির অভাবে হাঙ্গেরির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং বর্তমানে এটি কম সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে। সার্বিয়া নদীর পানি কমে যাওয়ায় কুলিং সিস্টেম ব্যাহত হওয়ার কারণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। রোমানিয়ায় দানিউব নদীর তীরে একটি বড় পাথর নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে সরিয়ে ফেলা হয়েছে, যাতে চেরনাভোদা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পানির প্রবাহ বাড়ানো যায়। বিদ্যুৎ খরচ কমাতে রোমানিয়ায় ডেসিয়া এবং ফোর্ড কোম্পানির দুটি গাড়ি কারখানা পনেরো দিনেরও বেশি সময় ধরে তাদের উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছে।

ইতালির দীর্ঘতম নদী পো-ও জুলাইয়ের শেষের দিকে উত্তরাঞ্চলীয় ক্রেমোনা শহরের কাছে ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। কর্তৃপক্ষ পুরো পো উপত্যকায় খরার সতর্কতা উচ্চ মাত্রায় উন্নীত করেছে এবং বিশেষজ্ঞরা পানীয় জলের সরবরাহে সম্ভাব্য ব্যাঘাত সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা জারি করেছেন। নদীর মোহনায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সমুদ্রের নোনা পানি নদীর তলদেশে প্রবেশ করছে, যা বাস্তুতন্ত্রকে চরমভাবে ব্যাহত করছে এবং ফসলে সেচ দেওয়া কৃষকদের জন্য মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করছে। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশন গ্রুপের বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উচ্চ তাপমাত্রায় আর্দ্রতার বাষ্পীভবন দ্রুত বাড়ছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো ইউরোপের দেশগুলো এই দীর্ঘস্থায়ী প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় নিজেদের অবকাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদী কী ধরনের পরিবর্তন আনবে।

banner
Link copied!