মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট, ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

এস্তোনিয়ায় গ্রীষ্মকালে নিজ বাড়িতে ক্যাফে খোলেন বাসিন্দারা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ৪, ২০২৬, ১২:৩৫ এএম

এস্তোনিয়ায় গ্রীষ্মকালে নিজ বাড়িতে ক্যাফে খোলেন বাসিন্দারা

এস্তোনিয়ায় প্রতি বছর গ্রীষ্মকাল শুরু হলেই সাধারণ মানুষ তাদের ব্যক্তিগত বাড়ির বাগান, গ্যারেজ এবং ঘরের জানালা খুলে অস্থায়ী ক্যাফে তৈরি করেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে এই ব্যতিক্রমী ঐতিহ্যের মাধ্যমে দেশটির সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন জীবন খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান পর্যটকরা। রাজধানী তালিনের অদূরে কেহরা শহরের এমনই এক পেছনের বাগানে হেইকি কালভিক নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা প্রতি বছর এই সাময়িক ক্যাফে পরিচালনা করেন। সুস্বাদু স্যুপ, ঐতিহ্যবাহী রুটি এবং ঘরে তৈরি আচার বিক্রির মাধ্যমে তিনি অতিথিদের আপ্যায়ন করেন। রান্নার প্রতি ভালো লাগা এবং নিজের অতিথিপরায়ণ প্রকৃতির কারণে তিনি এই অভিনব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন। স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।

দেশজুড়ে এ ধরনের শতাধিক উৎসব প্রতি বছর এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে আয়োজিত হয়ে থাকে। প্রায় দুই দশক আগে শুরু হওয়া এই জনপ্রিয় ঐতিহ্য এখন দেশটির সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে। কোথাও বড় প্যান্ডেল টানিয়ে বড় পরিসরে এই আয়োজন করা হয়, আবার কোথাও শিশুদের পরিচালিত ছোট লেবুর শরবতের স্টল দেখা যায়। এসব সাময়িক ক্যাফেতে ঘুরতে এসে পর্যটকরা এস্তোনিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও আবহমান সংস্কৃতি সম্পর্কে সরাসরি অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন। কারোলিন ভাহত্রে নামের আরেক স্থানীয় বাসিন্দা তার সাবেকি অ্যাপার্টমেন্টের পেছনের গ্যারেজে সাময়িক ক্যাফে তৈরি করে সুস্বাদু খাবার বিক্রি করেন। সেখানে টেম্পুরা সুশি রোল এবং ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের মতো বৈচিত্র্যময় খাবার পাওয়া যায়।

এই চমৎকার ঐতিহ্যের সূচনা হয়েছিল দুই হাজার সাত সালে হাইউমা নামক দ্বীপটিতে। দ্বীপটির পর্যটন প্রচারের দায়িত্বে থাকা কর্মীরা মূলত জুলাই মাসের ব্যস্ত মৌসুমের পরেও পর্যটকদের আকর্ষণ করার নতুন উপায় খুঁজছিলেন। দ্বীপটির প্রধান শহর কার্দলার দীর্ঘদিনের কফি পানের সংস্কৃতির সঙ্গে এই উদ্যোগের নিবিড় সংযোগ রয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সেখানে কাপড়ের কারখানায় কাজ করা মধ্য ইউরোপীয় শ্রমিকদের হাত ধরে কফি পানের অভ্যাস স্থানীয় মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। পরবর্তীতে মাঠের কাজে যাওয়ার সময় কফি পানের এই অভ্যাসের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা বিশেষ পরিচিতি লাভ করেছিলেন। দ্বীপের এই ঐতিহাসিক পটভূমি আধুনিক সংস্কৃতির সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশে গেছে।

শুরুতে মাত্র পনেরোটি পরিবার এই উদ্যোগে অংশ নিলেও বর্তমানে এটি একটি বিশাল উৎসবে রূপ নিয়েছে। হাইউমা দ্বীপের বর্তমান তিন দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষ অংশ নেন এবং বিভিন্ন ধরনের সুস্বাদু খাবার উপভোগ করেন। হাইউমা জাদুঘরের পরিচালক কাউরি কিভরামেস উল্লেখ করেছেন যে এই ঐতিহ্য কেবল খাবার বা পানীয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দ্বীপবাসীদের দীর্ঘদিনের অতিথি আপ্যায়নের মানসিকতার প্রকাশ। অতীতে ঝড়ের কবলে পড়া বিদেশি নাবিক ও ভ্রমণকারীদের সাহায্য করার মধ্য দিয়েই এই বন্ধুত্বপূর্ণ মানসিকতা গড়ে উঠেছিল বলে তিনি জানান। এই ইতিহাস আজও স্থানীয় বাসিন্দাদের আচরণে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম এবং স্থানীয় পর্যটন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এ ধরনের ক্যাফেগুলোর দিনক্ষণ ও অবস্থান সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। এস্তোনিয়ার এই ক্যাফেগুলো প্রচলিত কোনো রেস্তোরাঁ বা বাণিজ্যিক খাবারের উৎসব নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জীবনকে কাছ থেকে দেখার এক অনন্য সুযোগ। দেশটিতে ভ্রমণ করতে আসা পর্যটকদের কাছে এই অনন্য অভিজ্ঞতা অত্যন্ত সমাদৃত হয়েছে। বিশ্বজুড়ে যখন বাণিজ্যিক রেস্তোরাঁর আধিপত্য বাড়ছে, ঠিক সে সময় এস্তোনিয়ার সাধারণ মানুষের এই আন্তরিক উদ্যোগ আধুনিক ভ্রমণ সংস্কৃতির এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আগামী দিনগুলোতে এই ঐতিহ্য আরও প্রসার লাভ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

banner
Link copied!