সোমবার, ০৩ আগস্ট, ২০২৬, ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

ইথিওপিয়ার সীমান্ত সংঘাতে সুদানের দিকে পালাচ্ছে টাইগ্রে শরণার্থীরা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ৩, ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম

ইথিওপিয়ার সীমান্ত সংঘাতে সুদানের দিকে পালাচ্ছে টাইগ্রে শরণার্থীরা

ইথিওপিয়ার উত্তরাঞ্চলে সরকারি বাহিনী এবং টাইগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্টের মধ্যে নতুন করে ভয়াবহ সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার পর শত শত মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সুদানে আশ্রয় নিয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি এবং আল জাজিরার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। গত সপ্তাহের শেষ দিকে শেরেবিনা অঞ্চলে ভারী কামান এবং আধুনিক ড্রোনের মারাত্মক ব্যবহারের মাধ্যমে এই নতুন সামরিক আক্রমণ শুরু হয়। প্রায় তিন বছর আগে অত্যন্ত কষ্টার্জিত উপায়ে স্বাক্ষরিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শান্তি চুক্তি লঙ্ঘন করে এই সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ায় সমগ্র পূর্ব আফ্রিকা অঞ্চলে নতুন করে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তীব্র আকার ধারণ করেছে। তবে গত রবিবার বিকেল নাগাদ এই আকস্মিক লড়াইয়ের তীব্রতা কিছুটা কমে আসে এবং সংঘাতের গতিপ্রকৃতি কিছুটা মন্থর হয়।

সংঘর্ষের সূত্রপাত ও এর দায় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়েছে। টাইগ্রে বিদ্রোহীরা আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি করেছে যে ইথিওপীয় কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী কোনো ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি বা প্ররোচনা ছাড়াই তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত বড় ধরনের পদাতিক আক্রমণ চালিয়েছে। তারা সরকারের এই আগ্রাসী ও ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে অভিযোগ করেছে যে প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে পরিস্থিতি অবনতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিগত বেশ কয়েক মাস ধরে সরকারি ফেডারেল বাহিনী এবং টাইগ্রে আঞ্চলিক বাহিনী উত্তর ইথিওপিয়ার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে বিপুল পরিমাণ সেনা ও ভারী সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে রেখেছিল। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘাত উসকে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকার অভিযোগ তুলেছে, যা দীর্ঘদিনের ভঙ্গুর শান্তি প্রক্রিয়াকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এর আগে দুই পক্ষের মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদি ও রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে অন্তত ছয় লক্ষ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। আফ্রিকান ইউনিয়নের নির্ভরযোগ্য হিসাব অনুযায়ী সেই ভয়াবহ যুদ্ধ আধুনিক মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি করেছিল, যা সমগ্র অঞ্চলের অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। বর্তমানের এই নতুন সীমান্ত সংঘর্ষের ফলে সীমান্তবর্তী শরণার্থী শিবিরগুলোতেও তীব্র আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়েছে। আল জাজিরার মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদক নিশ্চিত করেছেন যে সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন স্থানে কামানের গোলার বিকট বিস্ফোরণ এবং অবিরাম গুলিবর্ষণের শব্দ স্পষ্টভাবে শোনা গেছে। এর ফলে ভীতসন্ত্রস্ত সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে নিজেদের বসতি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে সুদান সীমান্তে অন্তহীন ভিড় জমাচ্ছে।

জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার অফিস এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ইথিওপিয়া-সুদান সীমান্ত এলাকার এই সাম্প্রতিক উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। বর্তমানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে সীমান্তবর্তী এলাকায় জরুরি ত্রাণ সহায়তা পৌঁছানো এবং আহত সাধারণ মানুষকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। দুই পক্ষের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব যদি অবিলম্বে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শন না করে, তবে পুরো পূর্ব আফ্রিকা অঞ্চলে একটি অপূরণীয় মানবিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। সাধারণ মানুষ এবং স্থানীয় শরণার্থীরা চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছে, এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের মধ্যস্থতায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তির দাবি এখন সর্বমহলে জোরালো হয়ে উঠেছে।

banner
Link copied!