জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারের রাজপথগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি শান্ত ও নীরব রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। দেশটির সংবিধানে বিতর্কিত কিছু পরিবর্তনের জেরে দেশজুড়ে সাধারণ ধর্মঘট বা শাটডাউন আহ্বানের প্রেক্ষাপটে এই থমথমে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সাধারণ কর্মদিবসের চেনা ব্যস্ততা ও গাড়ির দীর্ঘ সারি ছাড়াই রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে যাতায়াত করতে দেখা গেছে নাগরিকদের। সরকারের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় রাজপথে বড় ধরনের জমায়েত ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগে থেকেই অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
নগরীর বিভিন্ন প্রবেশদ্বার এবং মূল সড়কে সাধারণ দিনের তুলনায় যানবাহনের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো কম। সকালে কাজের উদ্দেশ্যে বের হওয়া মানুষের ভিড় এবং নিয়মিত যানজট অনুপস্থিত থাকায় প্রধান ব্যবসায়ী কেন্দ্রগুলোতে যাতায়াত তুলনামূলকভাবে দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে। তবে এই আপাত শান্ত পরিবেশের আড়ালে শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুলিশের ভারী উপস্থিতি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। রাজপথের সংযোগস্থল ও জনসমাগমস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে যাতে যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো যায়।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং নাগরিক সমাজের বিভিন্ন সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে এই সাংবিধানিক সংস্কারের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে। তাদের মতে এই পরিবর্তনের ফলে দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ আরও বেশি সংকটাপন্ন হয়ে উঠবে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বৈরাতান্ত্রিক প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে পার্লামেন্টে পাস হওয়া এবং রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হওয়া বিধানগুলো বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদ আরও বাড়িয়ে দেওয়ার পথ সুগম করেছে। সমালোচকদের মতে এই ধরনের উদ্যোগের ফলে জনগণের সরাসরি ভোট দেওয়ার মৌলিক অধিকার খর্ব হয়েছে এবং রাজনৈতিক জবাবদিহিতা হুমকির মুখে পড়েছে।
বিরোধী পক্ষ এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে একটি সুপরিকল্পিত সাংবিধানিক চক্রান্ত হিসেবে অভিহিত করে দেশজুড়ে প্রতিবাদের ডাক দিয়েছিল। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে যে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিরবচ্ছিন্নভাবে বাস্তবায়নের জন্যই এই সংশোধনগুলো অপরিহার্য ছিল। প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন যে ঘন ঘন নির্বাচনের কারণে দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয় এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হয়। এই যুক্তির বিপরীতে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিরোধীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
রাজধানীর হারারেতে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের কারণে বিভিন্ন পার্ক ও জনবহুল চত্বরে জনসাধারণের প্রবেশ সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিরাপত্তার অজুহাতে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে জলকামানসহ বিশেষ ডাঙ্গা যান ও সাঁজোয়া বাহিনী প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হারারের কিছু এলাকায় ছোট ব্যবসায়ী ও দোকানপাট আংশিক খোলা থাকলেও অন্য অনেক এলাকার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দিনভর বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। ট্যাক্সি স্ট্যান্ড এবং অন্যান্য জনবহুল এলাকায় সাধারণ মানুষের চলাফেরা বেশ সতর্ক ও পরিমিত ছিল যা থমথমে পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পূর্বপ্রস্তুতি এবং কঠোর নিষেধাজ্ঞার ফলে দিনের শুরুতে বড় ধরনের কোনো প্রকাশ্য বিক্ষোভ বা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেনি। তবে চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, মুদ্রাস্ফীতি এবং শাসনব্যবস্থার কড়াকড়ির কারণে সাধারণ মানুষের মনে দীর্ঘমেয়াদি এক ধরনের চাপা উদ্বেগ ও আশঙ্কা কাজ করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা জিম্বাবুয়ের এই সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছেন। সরকারের অনমনীয় মনোভাব এবং বিরোধীদের লাগাতার প্রতিবাদের হুমকির মুখে দেশটির সামনের রাজনৈতিক দিনগুলো অত্যন্ত কঠিন ও সংঘাতপূর্ণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
