রবিবার, ০২ আগস্ট, ২০২৬, ১৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

গাজায় ধ্বংসস্তূপের মাঝেও তাকরিহি পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য শিক্ষার্থীদের

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ২, ২০২৬, ০৫:৩৬ পিএম

গাজায় ধ্বংসস্তূপের মাঝেও তাকরিহি পরীক্ষায় অভাবনীয় সাফল্য শিক্ষার্থীদের

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার খান ইউনিস এলাকার মুসা পরিবারের তিন ভাইবোন উচ্চ মাধ্যমিক বা তাকরিহি পরীক্ষার ফলাফলে দীর্ঘ সংগ্রাম ও অদম্য ধৈর্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। চলমান ধ্বংসযজ্ঞ ও চরম মানবিক সংকটের মাঝেও সামা, আবদুল্লাহ ও নাদা মুসা তাদের শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার ওপর সম্পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছিলেন, যাতে জীবনের অনিশ্চয়তা তাদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নিতে না পারে। ফল প্রকাশের পর তিন ভাইবোনের এই দীর্ঘ উৎকণ্ঠা আনন্দে রূপ নেয়, যখন তারা জানতে পারেন যে প্রত্যেকেই অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। পরিবারের এই তিন সদস্যের মধ্যে সামা অর্জন করেছেন সাতানব্বই দশমিক পাঁচ শতাংশ নম্বর, আবদুল্লাহ পেয়েছেন পিয়ানব্বই দশমিক ছয় শতাংশ এবং নাদা অর্জন করেছেন পিয়ানব্বই দশমিক চার শতাংশ নম্বর।

এই অভাবনীয় সাফল্যের পথটি একেবারেই সহজ ছিল না বলে জানিয়েছেন সর্বোচ্চ নম্বর অর্জনকারী সামা মুসা। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে চারপাশের পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন ছিল এবং মানসিকভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার শক্তিটুকুও অনেক সময় অবশিষ্ট থাকত না। তা সত্ত্বেও পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এবং দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে তিনি সমস্ত প্রতিকূলতাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে আবদুল্লাহ ও নাদার জন্য প্রাইভেট শিক্ষক বা নিয়মিত ক্লাসে যাওয়া সম্ভব ছিল না, তাই পরিবার তাদের বাড়িতেই শিক্ষকদের ব্যবস্থা করেছিল। তাদের মা হিন্দ মোহান্না জানান যে বছরের পর বছর ধরে সন্তানদের পেছনে যে যত্ন ও পরিশ্রম তারা ঢেলে দিয়েছেন, আজ তার সুফল দেখতে পেয়ে তাদের সমস্ত কষ্ট সার্থক হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের এই অদম্য স্পৃহার পেছনে অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন গাজার নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকগণও। মধ্য গাজার দের আল বালাহ এলাকার একটি শিক্ষাকেন্দ্রে গণিত শিক্ষক হান্না আল-সায়েদ অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তাকরিহি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান অব্যাহত রেখেছিলেন। ক্লাসে আসা অনেক শিক্ষার্থীর মনেই আপনজন হারানোর বেদনা ও তীব্র মানসিক আঘাতের ভার ছিল, যা তাদের পড়াশোনাকে আরও দুরূহ করে তুলেছিল। এই শিক্ষক কেবল শিক্ষাক্রম বুঝিয়েই ক্ষান্ত হননি, বরং মাতৃস্নেহে শিক্ষার্থীদের মানসিক শক্তি জোগাতে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত স্কুলগুলোর মেঝের ওপর মাদুর পেতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস করেছে এবং চরম অভাবের মাঝেও শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখার তীব্র প্রত্যয় দেখিয়েছে।

ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেম মিলিয়ে প্রায় ঊননব্বই হাজার শিক্ষার্থী তাকরিহি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। তবে ইসরায়েলি আগ্রাসনের কারণে গাজার শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে এবং জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী শতকরা সাতানব্বই ভাগের বেশি স্কুল ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যেও পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়া শিক্ষার্থীদের এই গল্প একটি পুরো প্রজন্মের টিকে থাকার লড়াই ও ভবিষ্যতের প্রতি তাদের অবিচল আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রিয়জন হারানোর বেদনা বুকে নিয়েও তালহা আবু সুক্কার মতো বহু শিক্ষার্থী নিজেদের লক্ষ্য অর্জনে পিছপা হননি, যা ফিলিস্তিনি জাতির শিক্ষা ও টিকে থাকার চিরন্তন সংগ্রামকে বারবার বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরছে।

banner
Link copied!