বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার পর অনেকেই একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন। মনে হয়, জীবনের সবচেয়ে কঠিন পাহাড়টা বুঝি পার হওয়া গেল। কিন্তু ক্যাম্পাসে পা রাখার কয়েক দিনের মধ্যেই বোঝা যায়, আসল যাত্রা তো সবে শুরু। নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধু, নতুন স্বাধীনতা আর নতুন দায়িত্বের এই ভারসাম্য সামলাতে গিয়ে প্রথম সেমিস্টারের উচ্ছ্বাসে অনেকেই কিছু সাধারণ ভুল করে বসেন। এই ভুলগুলো কমবেশি সবার জীবনেই ঘটে, তবে সচেতন থাকলে শুরু থেকেই নিজের পথটা অনেক বেশি গোছানো রাখা সম্ভব।
শুরুতেই অনেক শিক্ষার্থী ক্লাসকে হালকাভাবে নেন। স্কুল বা কলেজের মতো কড়া নিয়মের বাধ্যবাধকতা এখানে না থাকায় অনেকেই ভাবেন ক্লাস মিস দিলে খুব একটা ক্ষতি নেই। কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখা যায় কোর্সের অর্ধেকের বেশি শেষ হয়ে গেছে এবং সিলেবাসের পাহাড় দেখে তাল সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। আরেকটি বড় ভুল হলো নিজের বিভাগ বা ব্যাচের বন্ধুদের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ থাকা। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠ্যবইয়ের জায়গা নয়, এটি একটি বিশাল দুনিয়া। বিভিন্ন বিভাগের মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ এখানেই সবচেয়ে বেশি, যা ভাবনার জগৎ প্রসারিত করতে সাহায্য করে।
ক্যাম্পাস জীবনে স্বাধীনতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে দায়িত্বও। সময় ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব না দেওয়া অনেক শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কখন ক্লাস, কখন আড্ডা আর কখন নিজের কাজগুলো সারবেন তার রুটিন না থাকলে সেমিস্টারের শেষে প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি হয়। আবার র্যাগিংয়ের ভয় বা সংকোচে অনেকেই সিনিয়র ভাইয়া বা আপুদের এড়িয়ে চলেন। অথচ সব সিনিয়র মোটেও ভয়ের নন, বরং তারাই ক্যাম্পাস জীবনে সবচেয়ে ভালো গাইড হতে পারেন। কোনো কোর্সে কীভাবে ভালো করতে হবে বা শিক্ষকের ক্লাসে কী খেয়াল রাখতে হবে, সে বিষয়ে তাদের পরামর্শ জাদুর মতো কাজ করে।
অনেকেই কলেজের মতো পরীক্ষার আগের রাতের ওপর ভরসা করে থাকেন, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল সিলেবাসে এই কৌশল সব সময় কাজ করে না। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি এখানে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। পাশাপাশি ক্লাব বা সহশিক্ষা কার্যক্রমকে অবহেলা করাও একটি বড় ভুল। অনেকে শুধু রেজাল্টের পেছনে ছোটার কারণে কোনো সংগঠন বা ক্লাবে যোগ দেন না, অথচ ক্যারিয়ার গড়া ও ব্যক্তিত্ব গঠনে দলবদ্ধ হয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা খুবই জরুরি।
নতুন জায়গায় এসে চারপাশের মেধাবী মুখ দেখে অনেকে অহেতুক অন্যদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করতে শুরু করেন। কে কতটা জনপ্রিয় বা কার কত বন্ধু—এই তুলনা নিজের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং ব্যক্তিগত বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। এছাড়া ক্যাম্পাসে বছরজুড়ে নানা রকম সেমিনার, কর্মশালা বা স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম চলতে থাকে, যা অনেকে পাত্তা দেন না। এসব প্ল্যাটফর্ম নিজের লুকানো প্রতিভা আবিষ্কারের দারুণ সুযোগ। মানসিক চাপকেও অনেকে গুরুত্ব দেন না, কিন্তু একাকীত্ব বা নতুন পরিবেশে খাপ না খাওয়ানোর কষ্ট চেপে রাখা ঠিক নয়। সবার শেষে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে শুধুই সিজিপিএ বা ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। এটি জীবনের এমন একটি সময় যা আর কখনো ফিরে আসবে না। সুন্দর সম্পর্ক গড়া, নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন এবং বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো স্মৃতিগুলোও জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে থেকে যায়।
