বিতর্কিত একটি বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাতিল হওয়ার পর ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব এবং কার্যক্রমে নিজেদের পূর্ণ অনাস্থা প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা উয়েফা। বিবিসি স্পোর্ট এবং রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রতিযোগিতার শেয়ার বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির প্রস্তাবটি গত শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেন ইনফান্তিনো। এর পরপরই উয়েফার পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানানো হয় এবং এই সিদ্ধান্তকে সমগ্র ফুটবলের জন্য একটি বিজয় হিসেবে অভিহিত করা হয়।
উয়েফা তাদের দীর্ঘ বিবৃতিতে ইনফান্তিনোকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে জানিয়েছে যে তিনি ২০১৬ সালে সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। সংস্থাটি স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি স্বচ্ছতা ও ফুটবল উন্নয়নের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। অথচ বর্তমান নেতৃত্ব সেই আদর্শ থেকে সরে এসে গোপন ও অস্বচ্ছ উপায়ে চুক্তি কার্যকরের চেষ্টা চালিয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানিয়েছে ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
আগামী মার্চ মাসে ফিফা কংগ্রেসে চতুর্থ মেয়াদে সভাপতি পদে পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ইনফান্তিনো। ঠিক এমন একটি সময়ে উয়েফার এই কঠোর অবস্থান তার জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। শুধু উয়েফাই নয়, বরং ফুটবলের সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সদস্য ও সংস্থাগুলোও বর্তমান নেতৃত্বের স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোও এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করে ফিফার পরিচালনা পর্ষদের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছে।
ফুটবল মহলে এই পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ তুঙ্গে পৌঁছেছে এবং এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনসহ অন্যান্য আঞ্চলিক সংস্থাও বর্তমান সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। তবে ফিফার পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। যা কম স্পষ্ট তা হলো এই সংকটের পর ফিফার ভেতরে ক্ষমতার সমীকরণ কীভাবে বদলাবে এবং আগামী নির্বাচনে এর কী ধরনের প্রভাব পড়বে।
নরওয়েসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ফুটবল ফেডারেশনের প্রধানরা বলেছেন যে খেলার বৃহত্তর স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক ফুটবল সহযোগিতার পুরো কাঠামোটি অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তারা বিশ্বাস করেন যে পর্দার আড়ালের ক্ষমতা দখলের লড়াই বন্ধ করে এখনই ফুটবলের সুশাসন নিশ্চিত করার সময় এসেছে। বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থায় আস্থার এই সংকট ভবিষ্যতে খেলাটির ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকরা।
বিশ্লেষকদের মতে, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রশাসনিক সংকট। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে ফিফার বিভিন্ন নীতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও উয়েফার পক্ষ থেকে এ ধরনের আক্রমণাত্মক ও সরাসরি আক্রমণ অতীতে খুব কমই দেখা গেছে। সামনের দিনগুলোতে ফিফা এই সংকট মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর চাপের মুখে ইনফান্তিনো তার অবস্থান ধরে রাখতে পারেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ইংল্যান্ডের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এবং অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় সংস্থাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে যে বৈশ্বিক ফুটবলকে স্বচ্ছতার সঙ্গে পরিচালনা করার জন্য একটি নিরপেক্ষ ও কঠোর মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি। বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ ফুটবলপ্রেমীর আবেগ ও স্বার্থ রক্ষায় ফিফাকে তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রমে আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। এই পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকে এবং ফুটবলের ক্ষমতার ভারসাম্যে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তা সময়ই বলে দেবে।
