শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬, ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে টুথপেস্ট, প্রাকৃতিক বিকল্প হিসেবে মিসওয়াক

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ৩০, ২০২৬, ১১:৫১ পিএম

স্বাস্থ্যঝুঁকিতে টুথপেস্ট, প্রাকৃতিক বিকল্প হিসেবে মিসওয়াক

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং রয়টার্স ও বিবিসি নিউজের মতো সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বাণিজ্যিক টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন ব্যবহৃত এই রাসায়নিক উপাদানগুলো দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা বারবার সতর্ক করেছেন। আধুনিক বিজ্ঞানের এই নতুন সতর্কবার্তার পর বিশ্বজুড়ে মুসলিমদের মধ্যে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে নবীজির সুন্নাহ মিসওয়াক, যা চৌদ্দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতার এক সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

ইসলামি শরিয়তে শারীরিক পরিচ্ছন্নতা এবং পবিত্রতার ওপর সব সময়ই অত্যন্ত জোর দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে ইরশাদ করেছেন যে, তিনি তাওবাকারীদের এবং অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন (সুরা বাকারা, ২:২২২)। মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হিসেবে মুখ ও দাঁতের পরিচ্ছন্নতা এই সার্বিক পবিত্রতারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইসলামি জ্ঞান ও ঐতিহ্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিসওয়াকের প্রতি যে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন, তা শুধু দাঁত পরিষ্কার করার একটি সাধারণ পদ্ধতি নয়, বরং এটি ইবাদতের পূর্বপ্রস্তুতি এবং আল্লাহর পূর্ণ সন্তুষ্টি অর্জনের একটি অন্যতম প্রধান আধ্যাত্মিক মাধ্যম।

নবীজির সুন্নাহ মিসওয়াক নিয়ে প্রামাণ্য হাদিসের গ্রন্থগুলোতে অসংখ্য নির্ভরযোগ্য বর্ণনা রয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, উম্মতের জন্য কষ্টকর না হলে তিনি প্রত্যেক নামাজের সময় তাদের মিসওয়াক করার নির্দেশ দিতেন (সহিহ বুখারি, ৮৮৭)। এই ঐতিহাসিক হাদিসটি অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, মিসওয়াক শুধু একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস নয়, বরং এটি ইবাদতের সাথে গভীরভাবে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। অন্য একটি হাদিসে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, মিসওয়াক মুখকে পবিত্র করে এবং মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে (সুনানে ইবনে মাজাহ, ২৮৯)।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বর্ণাঢ্য জীবনের একেবারে শেষ দিনগুলোতেও এই গুরুত্বপূর্ণ আমলটি কখনো ত্যাগ করেননি। হজরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেছেন যে, নবীজির শেষ অসুস্থতার সময় যখন আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর তাজা মিসওয়াকের একটি ঢাল নিয়ে ঘরে প্রবেশ করেন, তখন নবীজি দুর্বল থাকা সত্ত্বেও সেটির দিকে তাকিয়েছিলেন। হজরত আয়েশা বিষয়টি বুঝতে পেরে মিসওয়াকটি নরম করে তাঁর হাতে তুলে দেন এবং তিনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে দাঁত পরিষ্কার করেন (সহিহ বুখারি, ৪৪৫১)। জীবনের অন্তিম মুহূর্তে মৃত্যুশয্যায় শুয়েও পরিচ্ছন্নতার প্রতি তাঁর এই গভীর মনোযোগ ও যত্নশীলতা বর্তমান যুগের সব মানুষের জন্য এক বিশাল শিক্ষণীয় বিষয়।

রাতে তাহাজ্জুদের নামাজের জন্য ঘুম থেকে ওঠার পর এবং বাইরে থেকে নিজের ঘরে প্রবেশের সময়ও তিনি নিয়মিতভাবে মিসওয়াক করতেন বলে একাধিক বর্ণনায় পাওয়া যায় (সুনানে আবু দাউদ, ৫১)। হজরত আবু আইয়ুব আনসারি রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, লজ্জাশীলতা, সুগন্ধি ব্যবহার, মিসওয়াক করা এবং বিবাহ হলো পূর্ববর্তী সব নবীদের সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত (জামে তিরমিজি, ১০৮০)। এর মাধ্যমে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে, এটি কেবল ইসলামের শেষ নবীর উদ্ভাবিত কোনো আমল ছিল না, বরং যুগের পর যুগ ধরে এটি সব নবীদের একটি সাধারণ ও পবিত্র অভ্যাস ছিল।

আধুনিক যুগে চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি অনেক দূর এগিয়েছে, যার ফলে দাঁতের পরিচর্যায় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক টুথপেস্ট এবং কৃত্রিম প্লাস্টিকের তৈরি টুথব্রাশের ব্যবহার বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তবে এই কৃত্রিম উপাদানগুলোর ওপর মানুষের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা এখন নতুন ধরনের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশবিদরা আশঙ্কা করছেন যে, টুথপেস্টে থাকা এই অতি সূক্ষ্ম প্লাস্টিক কণাগুলো মানুষের শরীরের ভেতরে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদি জটিল রোগের কারণ হতে পারে। একই সাথে এগুলো দৈনন্দিন ব্যবহারের পর পানির সাথে মিশে নদী ও সমুদ্রের প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যকেও মারাত্মকভাবে ধ্বংস করছে।

এই গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টি ব্যাপকভাবে সামনে আসার পর অনেক সচেতন মানুষ এখন পুনরায় সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানের দিকে ঝুঁকছেন। নিম, জয়তুন বা পিলু গাছের ডাল থেকে তৈরি মিসওয়াক এক্ষেত্রে মানবদেহের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব একটি বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো, বিশ্বব্যাপী টুথপেস্ট উৎপাদনকারী বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কবে নাগাদ জনস্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে তাদের পণ্য থেকে এই ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক সম্পূর্ণরূপে বাদ দেওয়ার কার্যকর আইনি উদ্যোগ গ্রহণ করবে। একজন সচেতন মুসলমানের জন্য আধুনিক এই স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোর পাশাপাশি নবীজির সুন্নাহ মিসওয়াক পালনের মাধ্যমে দৈনন্দিন জীবনে আধ্যাত্মিক ও শারীরিক উভয় ধরনের পবিত্রতা অর্জন করার এক অনন্য ও চিরস্থায়ী সুযোগ রয়েছে।

banner
Link copied!