সাহারা মরুভূমির বুকে অবস্থিত মরিটানিয়া বিশ্বের অন্যতম কম ভ্রমণ করা দেশ হিসেবে পরিচিত, যেখানে প্রতি বছর ১০,০০০-এর কম আন্তর্জাতিক পর্যটক পা রাখেন। আফ্রিকার এই বিশাল রাষ্ট্রটি একদিকে যেমন প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক, অন্যদিকে আধুনিক বিশ্বের কোলাহল থেকে অনেকটাই দূরে। মরিটানিয়ার প্রায় ৯০ শতাংশ ভূমি সাহারা মরুভূমির আওতায় পড়ে। পর্যটন অবকাঠামোর অভাব এবং নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে অনেক ভ্রমণকারী এখানে যেতে দ্বিধা করেন। তবে বাস্তবতা হলো, ২০১১ সালের পর থেকে দেশটিতে কোনো বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেনি। গ্লোবাল টেরোরিজম ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় এটি পর্যটকদের জন্য বর্তমানে অনেক বেশি নিরাপদ।
মরিটানিয়ার উত্তর উপকূলের নুয়াদিবা শহরটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৎস্য বন্দর। ক্যানারি স্রোতের প্রভাবে এখানকার গভীর সমুদ্রের পানি পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। সার্ডিনেলা, ম্যাকেরেল এবং অক্টোপাসের বিশাল ভাণ্ডার এখানে পাওয়া যায়। হাজার হাজার মাছ ধরার নৌকা এই বন্দরের তীরে সারিবদ্ধভাবে নোঙর করে থাকে। উপকূলীয় এই দৃশ্য এতই বিশাল যে তা মহাশূন্য থেকেও দেখা যায়। মাছ শিকার এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই জনপদটি দেশটির অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
দেশের রাজধানী নুয়াকশুত যেন মরুভূমির বুক চিরে জেগে ওঠা এক শহর। প্রায় ৫০ লক্ষ মানুষের এই দেশে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ রাজধানীতে বসবাস করেন। নুয়াকশুত দেখতে অনেকটা আফ্রিকার অন্যান্য রাজধানীর মতো হলেও এর বিশেষত্ব হলো এর বালুকাময় পরিবেশ। শহরের কেন্দ্রস্থলে আধুনিক সরকারি ভবন এবং মসজিদ থাকলেও রাস্তার একটি বড় অংশ বালুতে ঢাকা। ফলে এই জনবহুল শহরটিকে একটি বিশাল এবং অতিথিপরায়ণ গ্রামের মতো মনে হয়। আধুনিকতা এবং প্রকৃতির এই মেলবন্ধন পর্যটকদের অবাক করে।
মরিটানিয়ার উট সংস্কৃতি দেশটিকে করেছে অনন্য। দেশটিতে প্রায় ২০ লক্ষ উট রয়েছে এবং মাংস বা দুধ উৎপাদনের পাশাপাশি যাতায়াতের জন্য স্থানীয়রা উটের ওপর নির্ভরশীল। নুয়াকশুতের অদূরে অবস্থিত বেইলা উটের বাজার আফ্রিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার। এখানে শত শত উট প্রদর্শিত হয় এবং ক্রেতারা উচ্চমূল্যে সেগুলো ক্রয় করেন। সীমান্ত সুরক্ষায় দেশটির সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও অনেক ক্ষেত্রে উট ব্যবহার করে থাকেন।
মরিটানিয়ার পূর্ব অঞ্চলে যাওয়ার জন্য রয়েছে বিখ্যাত রাস্তা রুট দি এস্পোয়ার বা আশার সড়ক। নুয়াকশুত থেকে নিমা পর্যন্ত ১,১০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রাস্তাটি মরুভূমির বুক চিরে চলে গেছে। নিমা শহরটি ইউনেস্কো স্বীকৃত প্রাচীন শহর উয়ালাতার প্রবেশদ্বার। মরুভূমির মধ্য দিয়ে দীর্ঘ যাত্রায় মুসলিম যাত্রীরা সময়মতো সালাত আদায়ের জন্য বিরতি নেন। গভীর রাতে মরুভূমির মাঝখানে যাত্রা বিরতির সময় আকাশের নিচে তাবু খাটিয়ে ঘুমানোর অভিজ্ঞতা ভ্রমণকারীদের জন্য অনন্য। উয়ালাতা শহরের মেয়র সিদাতি দিয়ে জানান, আগে এখানে পর্যটকদের ভিড় থাকলেও বর্তমানে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীর সংখ্যা খুবই কম। এই রহস্যময় এবং নিস্তব্ধ সাহারা ভ্রমণ যে কোনো ভ্রমণপিপাসুর জন্য এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
