বুধবার, ০৩ জুন, ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ে ম্যাড হানি শিকারের রোমাঞ্চকর গল্প

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুন ৩, ২০২৬, ০৪:৫৭ পিএম

হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ে ম্যাড হানি শিকারের রোমাঞ্চকর গল্প

ছবি - Ai

নেপালের সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালার দুর্গম পাহাড়ি ঢালে প্রতি বছর এক রোমাঞ্চকর এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক কর্মযজ্ঞের সূচনা হয়। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য স্থানীয় আদিবাসীরা এক বিশেষ ধরনের মধু সংগ্রহের উদ্দেশ্যে নিজেদের জীবন বাজি ধরেন। বিশ্বজুড়ে এই মধু ম্যাড হানি বা এক ধরনের বিশেষ নেশা ও বিভ্রম সৃষ্টিকারী মধু নামে পরিচিত। এটি কেবল একটি সাধারণ প্রাকৃতিক খাদ্য উপাদান নয়, বরং এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক প্রাচীন হিমালয়ী সংস্কৃতি এবং চরম সাহসিকতার দীর্ঘ ইতিহাস। নেপালের ঐতিহ্যবাহী গুরুং উপজাতির মানুষ শত শত বছর ধরে এই বিপজ্জনক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন, যা বর্তমান আধুনিক বিশ্বের মানুষের কাছে এক পরম বিস্ময় হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই মধুর বিশেষত্ব এবং এর ঔষধি গুণের পাশাপাশি এর ভেতরের মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি একে অন্য সব মধু থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করেছে।

পাহাড়ি খাড়া ক্লিফ বা পাথুরে দেয়াল থেকে এই মধু শিকারের কাজটি কতটা বিপজ্জনক হতে পারে তা সাধারণ মানুষের কল্পনা করাও কঠিন। অভিজ্ঞ শিকারীরা শত শত মিটার উঁচু খাড়া পাহাড়ে শুধুমাত্র একটি সাধারণ দড়ির তৈরি মই ব্যবহার করে ওপরে চড়েন। সামান্য একটু অসাবধানতা বা পায়ের ভারসাম্য হারানোর অর্থ হলো নিশ্চিত মৃত্যু। এই চরম ঝুঁকির মাঝেই তাদের মুখোমুখি হতে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আকৃতির বন্য মৌমাছির, যার বৈজ্ঞানিক নাম এপিস ল্যাবোরিওসা। এই মৌমাছিগুলো সাধারণ মৌমাছির চেয়ে অনেক বড় এবং প্রায় তিন সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এদের হুল এতটাই শক্তিশালী এবং দীর্ঘ যে তা শিকারীদের মোটা কাপড়ের প্রতিরক্ষা ভেদ করেও শরীরে বিদ্ধ হতে পারে। এই উন্মত্ত মৌমাছিদের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে শিকারীরা এক বিশেষ প্রাচীন কৌশল ব্যবহার করেন। তারা পাহাড়ের নিচে কিছু নির্দিষ্ট পাতা পুড়িয়ে ঘন ধোঁয়া তৈরি করেন, যা ওপরে উঠে মৌমাছিদের কিছুটা শান্ত ও দিশেহারা করে তোলে এবং এটিই শিকারীদের একমাত্র আত্মরক্ষা ব্যবস্থা।

এই মধুর এমন অদ্ভুত ও তীব্র প্রতিক্রিয়ার বৈজ্ঞানিক কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে গবেষকরা হিমালয়ের অনন্য উদ্ভিদের সন্ধান পেয়েছেন। পাহাড়ি অঞ্চলের সুউচ্চ ঢালে প্রচুর পরিমাণে রোডোডেনড্রন ফুল ফোটে। এই বিশেষ ফুলের মধ্যে এক ধরনের শক্তিশালী প্রাকৃতিক উপাদান থাকে যাকে গ্রেয়ানোটক্সিন বলা হয়। বসন্তকালে যখন এই বিশাল মৌমাছিরা রোডোডেনড্রন ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে তাদের চাকে জমা করে, তখন সেই বিষাক্ত গ্রেয়ানোটক্সিন মধুর সাথে মিশে যায়। এর ফলেই মধুটিতে এক ধরনের তীব্র মানসিক ও শারীরিক বিভ্রম বা হ্যালুসিনেশন সৃষ্টির ক্ষমতা তৈরি হয়। এই কারণে প্রাচীনকাল থেকেই এই মধুকে একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় সেবনের নিয়ম রয়েছে এবং এর বাণিজ্যিক মূল্যও সাধারণ মধুর চেয়ে অনেক বেশি।

ম্যাড হানি সেবনের অভিজ্ঞতা সাধারণ কোনো মধুর মতো মিষ্টি বা আরামদায়ক নয়, বরং এটি বেশ তীব্র ও ঝাঁঝালো। এই মধু মুখে দেওয়ার সাথে সাথেই জিহ্বায় একটি হালকা তেতো স্বাদ এবং গলায় তীব্র জ্বালাপোড়া অনুভব হয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষের শরীরে এক ধরনের অবশ ভাব চলে আসে। প্রথম দিকে শরীরের তাপমাত্রা আকস্মিকভাবে কমে যাওয়া এবং হাত ও পায়ের আঙ্গুলের ডগাগুলো অবশ হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। এর পাশাপাশি তীব্র মাথাব্যথা, মাথা ঘোরানো এবং বমি বমি ভাবের মতো গুরুতর শারীরিক অস্বস্তি শুরু হতে পারে। অনেক সময় অতিরিক্ত সেবনের ফলে মানুষ তীব্র বমি করতে শুরু করে, যা এই মধুর ভেতরে থাকা গ্রেয়ানোটক্সিনের বিষক্রিয়ার একটি প্রত্যক্ষ বহিঃপ্রকাশ।

প্রাচীনকাল থেকে হিমালয় অঞ্চলের স্থানীয় মানুষেরা এই ম্যাড হানি-কে বিভিন্ন কঠিন রোগের ঔষধ এবং এক ধরনের প্রাকৃতিক কামোদ্দীপক হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। তবে স্থানীয় চিকিৎসায় এর ব্যবহারের মাত্রা অত্যন্ত সীমিত এবং সুনির্দিষ্ট। সাধারণত এক চা চামচের সামান্য অংশ বা তার চেয়ে কম পরিমাণ মধু সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়। এর চেয়ে সামান্য বেশি পরিমাণে মধু গ্রহণ করলে মানুষের হৃদস্পন্দন বা হার্ট রেট মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে রক্তচাপ কমে যাওয়া, সাময়িক পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস এবং দীর্ঘ সময় অচেতন বা কোমায় চলে যাওয়ার মতো ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন যে, মাত্র এক চামচের বেশি মধু অসাবধানতাবশত খেয়ে ফেললে একজন সুস্থ মানুষ টানা বারো ঘণ্টা পর্যন্ত সম্পূর্ণ অবশ বা অচেতন অবস্থায় থাকতে পারেন, যা ক্ষেত্রবিশেষে মৃত্যুর কারণও হতে পারে।

এই চরম জীবননাশী ঝুঁকি নিয়ে যারা বছরের পর বছর ধরে মধু সংগ্রহ করছেন, সেই আদিবাসী শিকারীদের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত করুণ। পাহাড়ের চূড়ায় মৌমাছির কামড় এবং মৃত্যুর সাথে লড়াই করে যে মধু তারা সংগ্রহ করেন, তার জন্য তারা খুবই সামান্য বা নামমাত্র পারিশ্রমিক পেয়ে থাকেন। অথচ এই মধুই যখন আন্তর্জাতিক বাজারে এবং আধুনিক বড় শহরগুলোতে পৌঁছায়, তখন তা অত্যন্ত চড়া ও আকাশচুম্বী দামে বিক্রি হয়। এই ঐতিহ্যবাহী পেশার পেছনে একদিকে যেমন জড়িয়ে আছে আদিম সংস্কৃতির প্রাচীন গৌরব, অন্যদিকে তেমনি প্রকাশ পায় চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য ও শোষণ। এই প্রাচীন ও ঝুঁকিপূর্ণ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি এর সাথে জড়িত মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা এবং এর মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে সঠিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা এখন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

banner
Link copied!