যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে তীব্র বিদ্যুৎ ও পেট্রোল সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ সোলার প্যানেল এবং গাড়িতে রান্নার গ্যাস ব্যবহারের মতো ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প জ্বালানি বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে বলে আল জাজিরা এক বিশেষ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করেছে। দেশটির তাইজ শহরের স্থানীয় প্রশাসন ও চিকিৎসা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে যে ত্রুটিপূর্ণ সোলার ব্যাটারি বিস্ফোরণ এবং অনিয়ন্ত্রিত গ্যাস সিলিন্ডারের কারণে ইয়েমেনে অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধের ফলে দেশটির সরকারি বিদ্যুৎ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ায় নাগরিকরা এই বিপজ্জনক পথ অবলম্বন করছেন।
তাইজ শহরের আল থাওরা জেনারেল হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের প্রধান চিকিৎসক মোহাম্মদ সাঈদ জানিয়েছেন যে সোলার পাওয়ার সিস্টেমের লিথিয়াম ব্যাটারি বিস্ফোরণে সম্প্রতি এক মা ও তার দুই সন্তানের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এই একটি হাসপাতালেই দুই হাজার সাতশত ঊনত্রিশটি অগ্নিদগ্ধ হওয়ার ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে যার মধ্যে অন্তত তেরো জন মারা গেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে হতাহতদের একটি বড় অংশই ঘরে রাখা নিম্নমানের ব্যাটারি বিস্ফোরণ এবং পেট্রোলের পরিবর্তে গাড়িতে এলপিজি ব্যবহারের কারণে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।
ইয়েমেনের বাজারে পেট্রোলের আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে চালকরা বিশেষ করে বাস চালকরা তাদের যানবাহন রান্নার গ্যাসে রূপান্তর করছেন যা প্রতিনিয়ত চলন্ত বোমা হিসেবে রাস্তায় চলাচল করছে। তাইজ পুলিশের পরিকল্পনা ও তথ্য ব্যবস্থাপক মালিক আল সাবরি জানিয়েছেন যে পুরো প্রদেশে ঘটা মোট অগ্নিকাণ্ডের ত্রিশ থেকে চল্লিশ শতাংশই ঘটছে সোলার ব্যাটারি বিস্ফোরণের কারণে। উদ্ভূত পরিস্থিতির মুখে তাইজ পুলিশের সিভিল ডিফেন্স বিভাগ ইতিমধ্যে অনুমোদনহীনভাবে গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার স্থাপন নিষিদ্ধ করেছে এবং কঠোর নিরাপত্তা নীতি অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে।
বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী দাউদ আবদুল্লাহ জানিয়েছেন যে সোলার এনার্জি বা সৌরশক্তি মূলত একটি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা হলেও ইয়েমেনের নাগরিকরা প্রকৌশলীদের সাহায্য ছাড়া নিজেরাই তা স্থাপন করায় ভুলগুলো তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে অনেক পরিবার ব্যাটারি রাখার জন্য উপযুক্ত স্থান নির্বাচন না করে শোবার ঘরের ভেতরেই তা রেখে দেয় যার ফলে বিস্ফোরণের সময় ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি বেশি হয়। ইয়েমেনি গ্রিন মিডিয়া সেন্টারের তথ্য কর্মকর্তা রামেজ নাবিল সতর্ক করে বলেছেন যে চরম অর্থনৈতিক মন্দার কারণে মানুষ সস্তা ও নিম্নমানের তার এবং ব্যাটারি কিনছে যা এই দুর্যোগকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
যা কম স্পষ্ট তা হলো আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য সংস্থাগুলো ইয়েমেনের এই অভ্যন্তরীণ জ্বালানি ও নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় সরাসরি কোনো কারিগরি সহায়তা দেবে কি না। স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা গ্রিন এনার্জি বা পরিবেশবান্ধব সৌরশক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহারের জন্য দেশজুড়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর দাবি জানিয়েছেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের জীবন এখন প্রতিদিন নতুন নতুন প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং কাঠামোগত অব্যবস্থাপনার কারণে চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
