শনিবার, ০৪ জুলাই, ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩

চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব আনতে পারে আর্কটিক কাঠবিড়ালির শীতনিদ্রা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ৪, ২০২৬, ০৮:৫৮ পিএম

চিকিৎসাবিজ্ঞানে বিপ্লব আনতে পারে আর্কটিক কাঠবিড়ালির শীতনিদ্রা

আর্কটিক গ্রাউন্ড স্কুইরেল বা মেরু অঞ্চলের কাঠবিড়ালির শীতনিদ্রা মানব চিকিৎসায় ব্যবহার নিয়ে গবেষকরা কাজ করছেন বলে আলাস্কা ফেয়ারব্যাঙ্কস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা শনিবার জানিয়েছেন, বিবিসি নিউজ নিশ্চিত করেছে। উত্তর কানাডা, আলাস্কা এবং সাইবেরিয়ার তীব্র শীত থেকে বাঁচতে এই বিশেষ ধরনের প্রাণীরা বছরের প্রায় আট মাস মাটির নিচে অবশ হয়ে কাটিয়ে দেয়। এই দীর্ঘ সময়ে তারা কোনো খাবার বা পানি গ্রহণ করে না এবং এদের শরীরের তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নিচে নেমে যায়। বিজ্ঞানীদের মতে এই হিমায়িত অবস্থায় অলৌকিক উপায়ে বেঁচে থাকার ক্ষমতা মানবদেহের জটিল চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। কাঠবিড়ালির শীতনিদ্রা মানবদেহে প্রয়োগ করা সম্ভব হলে তা চিকিৎসা বিজ্ঞানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।

কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির শারীরবৃত্তীয় বাস্তুবিদ কোরি উইলিয়ামস জানান যে এই প্রাণীদের শরীরের অভ্যন্তরীণ বিপাকক্রিয়া বা মেটাবলিজম সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করার পদ্ধতিটি অত্যন্ত নিখুঁত। গবেষকরা দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই কাঠবিড়ালিগুলোকে নিয়ে নিবিড় গবেষণা পরিচালনা করছেন। তারা গবেষণাগারে একটি অন্ধকার এবং কৃত্রিম ঠান্ডা ঘরে রেখে এই প্রাণীদের প্রাকৃতিক গর্তের মতো পরিবেশ তৈরি করেন। সেখানে দেখা গেছে যে তীব্র ঠান্ডায় এদের হৃদস্পন্দন এবং শ্বাস-প্রশ্বাস এতটাই ধীর হয়ে যায় যে বাইরে থেকে প্রাণীদের জীবিত বা মৃত তা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ওরেগন হেলথ অ্যান্ড সায়েন্স ইউনিভার্সিটির নিউরোফিজিওলজিস্ট ডোমেনিকো টুপোন এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটিকে মানুষের কৃত্রিম চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত কার্যকরী করার আশা প্রকাশ করেছেন।

চিকিৎসকদের মতে স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক অথবা মস্তিষ্কের মারাত্মক আঘাতের পর মানবদেহের সংবেদনশীল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সুরক্ষিত রাখতে কৃত্রিমভাবে শরীর ঠান্ডা করার প্রয়োজন হয়। বর্তমানে বরফ বা বিশেষ ওষুধ ব্যবহার করে গুরুতর অসুস্থ রোগীদের শরীর ঠান্ডা করার চেষ্টা করা হলে মানবদেহ প্রাকৃতিকভাবে কাঁপুনির মাধ্যমে তার তীব্র বিরোধিতা করে। কিন্তু কাঠবিড়ালির এই বিশেষ জৈবিক সংকেত ব্যবহার করে যদি মানুষের শরীরের বিপাকক্রিয়া সরাসরি কমিয়ে দেওয়া যায় তবে শরীর নিজে থেকেই স্বাভাবিক নিয়মে ঠান্ডা হবে এবং কোনো ক্ষতিকর প্রতিরোধ তৈরি করবে না। এর ফলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকরা রোগীর জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করতে বা কৃত্রিম উপায়ে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য অনেক বাড়তি সময় পাবেন।

যা কম স্পষ্ট তা হলো মানবদেহের ওপর এই জটিল পদ্ধতির দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে এবং মানুষের জন্য এটি পুরোপুরি নিরাপদ হবে কি না। আলাস্কা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত গবেষক কেলি ড্রু জানান যে এই গবেষণার আরেকটি বড় লক্ষ্য হলো মানবদেহের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সময় মানুষের বিভিন্ন অঙ্গগুলোকে দেহের বাইরে দীর্ঘ সময় সতেজ রাখা। সাধারণ অবস্থায় মানবদেহের কোষগুলো যেভাবে দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এই বিশেষ পদ্ধতিতে তা সম্পূর্ণ রোধ করা সম্ভব হতে পারে। এমনকি ক্যানসার রোগীদের রেডিয়েশন থেরাপির ক্ষতিকারক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থেকে রক্ষা করতেও এই কোষীয় বিপাকক্রিয়া ধীর করার পদ্ধতি বড় ধরনের সুরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

দূর ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণায় নভোচারীদের দীর্ঘদিনের দূরপাল্লার যাত্রায় কৃত্রিম অবশ বা হাইবারনেশন অবস্থায় রাখার ক্ষেত্রেও এই জ্ঞান অত্যন্ত সফলভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে বলে বিজ্ঞান সাময়িকীগুলোতে দীর্ঘ আলোচনা চলছে। গবেষক সারাহ রাইস মনে করেন যে প্রকৃতির এই চরম পরিবেশে টিকে থাকা ক্ষুদ্র প্রাণীদের শরীর থেকে প্রাপ্ত তথ্য মানুষের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাকে অদূর ভবিষ্যতে আমূল বদলে দেবে। প্রকৃতির এই অনন্য সৃষ্টি এবং জীবনধারণের বিস্ময়কর কৌশল বিজ্ঞানীদের প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য উপহার দিচ্ছে। বিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে এই কাঠবিড়ালির শীতনিদ্রা রহস্য উন্মোচন শেষ পর্যন্ত মানব সভ্যতার প্রাণ রক্ষায় এক যুগান্তকারী এবং ঐতিহাসিক অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

banner
Link copied!