রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩

সিরিয়ায় নতুন অন্তর্বর্তীকালীন পার্লামেন্টের ঐতিহাসিক অধিবেশন

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ১২, ২০২৬, ১০:০০ পিএম

সিরিয়ায় নতুন অন্তর্বর্তীকালীন পার্লামেন্টের ঐতিহাসিক অধিবেশন

সিরিয়ার নবনিযুক্ত অন্তর্বর্তীকালীন পার্লামেন্ট রবিবার দামেস্কে তাদের প্রথম ঐতিহাসিক অধিবেশন সম্পন্ন করেছে বলে রয়টার্স, এএফপি ও আল জাজিরা নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক শাসক বাশার আল আসাদের পতনের প্রায় ১৯ মাস পর এই নতুন আইনসভা আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করল। আহমেদ আল-শারার নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা আসাদ সরকারকে উৎকন্ঠিতভাবে উৎখাত করার পর এটিই দেশের প্রথম সংসদীয় কার্যক্রম। নতুন এই সংসদ সদস্যরা দামেস্কের আইনসভা ভবনে তাদের সাংবিধানিক শপথ গ্রহণ করেন। এই অধিবেশনকে কেন্দ্র করে গোটা সিরিয়া জুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

উদ্বোধনী অধিবেশনে সিরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা সংসদ সদস্যদের দেশের জাতীয় স্বার্থকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন যে এই পরিষদকে দায়িত্বশীলতা ও যোগ্যতার একটি অনন্য মডেল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শারা আরও জোর দিয়ে বলেন যে একটি আধুনিক সিরিয়ার ইতিহাস গড়ে তুলতে সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। তিনি নতুন আইনসভাকে সত্য ও ন্যায়ের একটি শক্তিশালী মঞ্চ হিসেবে বর্ণনা করেন। এই পরিষদ দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

নতুন গঠিত এই পিপলস অ্যাসেম্বলি বা জনগণের পরিষদের মূল দায়িত্ব হবে দেশের জন্য একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা। দীর্ঘ চার দশক ধরে চলা আসাদ পরিবারের শাসন এবং গত ১৪ বছরের বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধের পর এই পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি ছিল। বিগত গৃহযুদ্ধে দেশটিতে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। ৪৩ বছর বয়সী প্রেসিডেন্ট শারা সিরিয়ার জন্য একটি নতুন যুগের সূচনা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতার কারণে সিরিয়া বর্তমানে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কারণে আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়াকে বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। নতুন এই আইনসভায় মোট ২১০টি আসন রয়েছে যার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য গত বছর আঞ্চলিক নির্বাচক মণ্ডলীর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশিষ্ট ৭০ জন সদস্যকে চলতি মাসের শুরুতে সরাসরি নিয়োগ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা। দীর্ঘস্থায়ী সংघात এবং জনসংখ্যা সংক্রান্ত সঠিক নথিপত্র না থাকার কারণে দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হয়নি বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। সমালোচকদের মতে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার ফলে আইনসভার ওপর নির্বাহী বিভাগের প্রভাব থেকে যাচ্ছে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো নতুন এই অন্তর্বর্তীকালীন পার্লামেন্ট কতটুকু স্বাধীনভাবে তাদের আইন প্রণয়ন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। ২০১৫ সালের সাময়িক সাংবিধানিক ঘোষণা অনুযায়ী এই আইনসভার ক্ষমতা কিছুটা সীমিত রাখা হয়েছে। এই সরকারের জন্য সংসদের আস্থা ভোটে জয়ী হওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। তবে এই পরিষদ নতুন আইন প্রস্তাব ও অনুমোদন করার পূর্ণ ক্ষমতা ভোগ করবে। ৩০ মাসের এই সংসদের মেয়াদ প্রয়োজনবোধে বৃদ্ধি করা যেতে পারে এবং স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত এটি কাজ করবে। এই নতুন আইনসভায় নারী সদস্যদের উপস্থিতি মোট আসনের প্রায় ১০ শতাংশ নিশ্চিত করা হয়েছে।

জাতিসংঘের সিরিয়া বিষয়ক উপ-বিশেষ দূত ক্লদিও কর্ডোন এই প্রথম অধিবেশনকে দেশের রাজনৈতিক উত্তরণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই আইনসভার কার্যক্রম অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে এবং যেকোনো প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার অর্থনীতি পুনর্গঠন, জনসেবামূলক খাতগুলোর শক্তিশালীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করাই এই সংসদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন। আসাদ পরবর্তী যুগের এই প্রথম সংসদীয় অধিবেশন সিরিয়ার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।

banner
Link copied!