শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩

বেলফাস্টের প্রাচীন এসি ব্যবস্থা ও আধুনিক শীতলীকরণ প্রযুক্তি

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : জুলাই ১১, ২০২৬, ০৯:৪৩ পিএম

বেলফাস্টের প্রাচীন এসি ব্যবস্থা ও আধুনিক শীতলীকরণ প্রযুক্তি

ছবি : সংগৃহীত

বিশ্বজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখন আর বিলাসবহুল কোনো বিষয় নয়, বরং তা জীবন বাঁচানোর অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বলে রয়টার্স ও বিবিসি নিউজ জানিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা যখন চরম পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে, তখন উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে অবস্থিত একটি ১২৩ বছর পুরোনো হাসপাতালের প্রাকৃতিক শীতলীকরণ ব্যবস্থা নতুন করে বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। রয়্যাল ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে ১৯০৩ সালে স্থাপিত এই প্রাচীন প্রযুক্তি প্রমাণ করছে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় সঠিক বায়ু চলাচলের গুরুত্ব কতটা গভীর।

এই পুরোনো ব্যবস্থায় ইটের দেয়াল ও লোহার কাঠামোর মধ্যে একটি বিশাল ছয় ব্লেডের লাল রঙের পাখা ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে এটি আর চালু নেই, তবে এর বিশাল পাখাগুলো এখনো সামান্য ধাক্কা দিলেই কোনো শব্দ ছাড়াই ঘুরতে শুরু করে। একসময় এই বিশাল পাখাটি নারকেলের ছোবড়ার তৈরি ভেজা দড়ির জালের ওপর দিয়ে বাতাস টেনে আনত। এরপর সেই শীতল বাতাস প্রায় ১৫০ মিটার দীর্ঘ একটি ঢালু করিডোর দিয়ে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে পৌঁছে যেত। তৎকালীন চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, বাইরের তাপমাত্রা যখন ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকত, তখন ভেতরের তাপমাত্রা আরামদায়ক ১৮ ডিগ্রিতে নামিয়ে আনা সম্ভব হতো।

ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল উনিশ শতকে হাসপাতালে বিশুদ্ধ বাতাসের ওপর জোর দিয়েছিলেন, তবে তখন কেবল জানালা খুলেই এই কাজ করা হতো। বেলফাস্টের শিল্পাঞ্চলের কালো ধোঁয়া থেকে বাঁচতে সম্পূর্ণ নতুন এই ব্যবস্থাটি নকশা করা হয়েছিল। এই ব্যবস্থার পাখাগুলো নির্মাণ করেছিল সেই একই কোম্পানি, যারা পরে টাইটানিক জাহাজের ভেন্টিলেশন পাখা তৈরি করেছিল। নারকেলের ছোবড়ার জাল কেবল বাতাস ঠান্ডা করত না, বরং কারখানার ধোঁয়া ও কয়লার গুঁড়ো আটকে বাতাস পরিষ্কার করার কাজও করত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান সময়ে চরম তাপপ্রবাহের কারণে মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং কিছু ওষুধের কার্যকারিতাও হ্রাস পাচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষক ডেভিড আইজেনম্যানের মতে, অতিরিক্ত গরমের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো কৃত্রিম শীতলীকরণ ব্যবস্থা। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী প্রায় ১,৯৫,০০০ মানুষের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে কেবল এসির কারণে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে চরম তাপপ্রবাহের সময় রোগীদের মৃত্যুর ঝুঁকি ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনতে পারে এই প্রযুক্তি।

এই একই ধারণার ওপর ভিত্তি করে ভারতের রাজস্থান রাজ্যের যোধপুরে একটি নতুন শীতলীকরণ কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। যোধপুরে যখন গ্রীষ্মের তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়, তখন সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে এই বিশেষ কেন্দ্রটি কাজ করে। সেখানে খস নামের এক ধরনের শুকনো ঘাসের তৈরি প্যানেল পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় এবং সৌরবিদ্যুতে চলা পাখার মাধ্যমে বাতাস টেনে আনা হয়। এটি বাইরের তুলনায় ভেতরের তাপমাত্রা অন্তত ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমাতে সক্ষম।

যোধপুরের কেন্দ্রটি নির্মাণে যুক্ত থাকা একটি পরিবেশবাদী সংগঠনের পরিচালক প্রিমা মাদান জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে উদ্বোধনের পর থেকে এটি নিয়মিত ব্যবহৃত হচ্ছে। নারী শ্রমিক, পণ্য সরবরাহকারী চালক ও রাস্তার হকাররা প্রতিদিন এই শীতলীকরণ কেন্দ্রে বিশ্রাম নিতে আসেন। মূলত বেলফাস্টের ১২৩ বছরের পুরোনো ধারণাটিই আজ ভিন্ন রূপে মরুভূমিতে হাজারো মানুষের প্রাণ রক্ষা করছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো, ভবিষ্যতে বিদ্যুৎবিহীন এমন পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিগুলো বিশ্বের অন্যান্য দেশে কতটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।

banner
Link copied!