চীন ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মৈত্রী ও পারস্পরিক সহায়তা চুক্তির ৬৫ বছর পূর্ণ হলো। ১৯৬১ সালের ১১ জুলাই বেইজিংয়ে চীনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ঝো এনলাই এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম ইল সুং এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। ছয় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও চুক্তিটি এখনো কার্যকর রয়েছে। চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, কোনো এক পক্ষ যদি সশস্ত্র হামলার শিকার হয়, তবে অন্য পক্ষ তাকে সহায়তা করতে বাধ্য থাকবে। এটি চীনের একমাত্র আনুষ্ঠানিক সামরিক চুক্তি, যা এই সম্পর্কের গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে।
চুক্তিটির ৬৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে উত্তর কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী পাক থায়ে সং বেইজিং সফর করেছেন। তবে গত ৬৫ বছরে পরিস্থিতির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। চীন দারিদ্র্যপীড়িত একটি বিপ্লবী রাষ্ট্র থেকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে, অন্যদিকে উত্তর কোরিয়া আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন এবং কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধ, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনা—সবকিছু পার হয়েও এই মৈত্রী আজও টিকে আছে।
এই সম্পর্কের মূলে রয়েছে কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা। কোরীয় যুদ্ধের সময় মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনী যখন চীনের সীমান্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন চীন হাজার হাজার সৈন্য উত্তর কোরিয়ায় পাঠিয়েছিল। সেই যুদ্ধের ইতিহাস উভয় দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছে এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তারা একে রক্তের বিনিময়ে গড়া সম্পর্ক বলে বর্ণনা করেন। আদর্শিক দিক থেকে উভয় দেশই সমাজতান্ত্রিক ধারার এবং পশ্চিমা বিশ্বের শক্তির উত্থান নিয়ে তাদের গভীর সন্দেহ রয়েছে। ওয়াশিংটনের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টাকে উভয় দেশই নিজেদের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে মনে করে।
তবে কেবল আদর্শিক মিলই এই সম্পর্কের ভিত্তি নয়। বেইজিং এখন বিশ্বজুড়ে বিদেশি বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে, যেখানে উত্তর কোরিয়া অনেকটাই নিজেকে বিশ্ব থেকে গুটিয়ে রেখেছে। বেইজিংয়ের কাছে স্থিতিশীলতা সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। চীন চায় না যে উত্তর কোরিয়ার বর্তমান সরকারের পতন ঘটুক, কারণ সেক্ষেত্রে সীমান্তে শরণার্থীর বিশাল ঢল নামার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া কোরীয় উপদ্বীপ যদি যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রশক্তি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হয়, তবে তা চীনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।
তাই উত্তর কোরিয়া চীনের জন্য একটি কৌশলগত বাফার জোন হিসেবে কাজ করে। এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে কোরীয় উপদ্বীপের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। চীন বেইজিংয়ের স্বার্থে উত্তর কোরিয়ার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি বলে মনে করে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক ও সামরিক নিরাপত্তার জন্য পিয়ংইয়ংয়ের কাছেও বেইজিংয়ের সমর্থন অপরিহার্য। এই বাস্তবতার কারণেই ৬৫ বছর পরেও এই মৈত্রী টিকে আছে এবং ভবিষ্যতের ভূ-রাজনীতিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
