গরমের ছুটিতে কোথাও বেড়াতে গেলে অনেকেরই অভিযোগ থাকে যে, তাদের চারপাশে থাকা অন্যদের তুলনায় মশা তাদেরই বেশি কামড়াচ্ছে। বিষয়টি কি শুধুই কাকতালীয় নাকি এর পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে? গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মানুষের শরীর থেকে নিঃসৃত ঘাম, নিঃশ্বাস এবং ত্বকের গন্ধ মশাদের জন্য বিশেষভাবে আকর্ষণীয়। এই প্রক্রিয়াটি মূলত জৈবিক সংকেতের ওপর ভিত্তি করে সম্পন্ন হয়, যা মশা দূর থেকে তাদের শিকার শনাক্ত করতে ব্যবহার করে।
ডারহাম ইউনিভার্সিটির জনস্বাস্থ্য ও কীটতত্ত্ব বিষয়ক অধ্যাপক স্টিভ লিন্ডসে এবং অন্যান্য গবেষকদের মতে, মশারা মূলত মানুষের শরীরের গন্ধ এবং নিঃশ্বাসের কার্বন ডাই-অক্সাইডের ওপর নির্ভর করে তাদের লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করে। নারী মশারাই মূলত রক্ত পান করে, কারণ তাদের ডিম তৈরির জন্য রক্তের প্রোটিন প্রয়োজন হয়। তারা যখন মানুষের দশ মিটার দূরত্বের মধ্যে থাকে, তখন তারা শরীরের তাপমাত্রা, আর্দ্রতা এবং ত্বকের ওপরে থাকা অণুজীব বা মাইক্রোবায়োম থেকে নির্গত উদ্বায়ী রাসায়নিক পদার্থের সাহায্য নেয়। আমাদের ত্বকে পাঁচশটিরও বেশি উদ্বায়ী জৈব যৌগ থাকে, যা বাতাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং মশারা সহজেই এর পার্থক্য করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থায় থাকা নারীরা মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেন। কারণ গর্ভাবস্থায় শরীরে বিপাকীয় চাহিদা বেড়ে যায় এবং নিঃশ্বাসের হার বৃদ্ধি পায়, যার ফলে শরীর থেকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। এছাড়া যারা শারীরিক ব্যায়াম করছেন, তাদের শরীর থেকেও অতিরিক্ত তাপ ও ঘাম উৎপন্ন হওয়ার কারণে তারা সাময়িকভাবে মশার পছন্দের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারেন। এমনকি শরীরের আকার যাদের বড়, তারাও বেশি তাপ উৎপন্ন করায় মশাকে বেশি আকৃষ্ট করেন।
ত্বকের মাইক্রোবায়োম বা অণুবীক্ষণিক জীবাণুর গঠন মশাকে আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে। নেদারল্যান্ডসের ওয়াগেনিনগেন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা দেখেছেন যে, যাদের শরীরে বিশেষ কিছু ব্যাকটেরিয়ার আধিক্য রয়েছে কিন্তু বৈচিত্র্য কম, তারা মশার জন্য বেশি আকর্ষণীয়। আমাদের শরীরের ব্যাকটেরিয়া ঘামের সঙ্গে মিশে এক ধরনের গন্ধ তৈরি করে, যা মানুষের নাকে ধরা না পড়লেও মশারা তা দারুণভাবে শনাক্ত করতে পারে। এছাড়া সমগোত্রীয় বা আইডেন্টিক্যাল টুইনদের ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, বংশগতি বা জিনের কারণেও মানুষের গায়ের গন্ধ মশাকে প্রভাবিত করে।
অনেক মানুষই মনে করেন যে রসুন খেলে বা ভিটামিন বি সাপ্লিমেন্ট নিলে মশা দূরে থাকে। তবে চিকিৎসা কীটতত্ত্ববিদ হিদার ফার্গুসনের মতে, এই ধারণাগুলোর সপক্ষে কোনো জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। মশা থেকে বাঁচার জন্য তিনি প্রমাণিত রিপেলেন্ট যেমন ডিট বা এই জাতীয় কার্যকর উপাদানের ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে শরীর ঢেকে রাখা পোশাক পরার ওপরও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। আবার অনেকে মনে করেন তারা বেশি মশার কামড় খাচ্ছেন, আসলে হয়তো কামড় খাওয়ার পর তাদের শরীরে সাধারণের চেয়ে বেশি চুলকানি বা প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে, যা তাদের এই ধারণা দিতে পারে যে মশা তাদেরই বেশি কামড়াচ্ছে। সব মিলিয়ে মশাদের এই পছন্দ মূলত জিনতত্ত্ব এবং শরীরের রাসায়নিক গঠনের ওপরই নির্ভর করে।
