গাজার আল-জাইতুন এলাকায় দুই বছর আগে ঘটে যাওয়া ইসরায়েলি বিমান হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া নিজেদের বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো স্বজনদের খোঁজে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে হাজি পরিবার। নভেম্বর মাসের ১৬ তারিখে ২০২৩ সালে ইসরায়েলি বিমান হামলায় তিন তলা বিশিষ্ট ভবনটি মাটির সঙ্গে মিশে যায়। সেই ভবনে বসবাস করা ৩০ জনেরও বেশি সদস্যের ভাগ্য বিপর্যয়ের এক দীর্ঘ ও কষ্টের গল্প এখন গাজার হাজার হাজার পরিবারের বাস্তব চিত্র। ফিদা হাজি ও তার চার সন্তান ওই দিন প্রাণে বেঁচে গেলেও, পরিবারের বাকি সদস্যদের কারো ভাগ্যে সেই সুযোগ জোটেনি।
ফিদা হাজির স্বামী আদনান হাজি এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা ওই হামলায় নিহত হন। ঘটনার পর ফিদা তার সন্তানদের নিয়ে নিরাপত্তার খোঁজে গাজার দক্ষিণাঞ্চলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তবে দীর্ঘ সময় পর যখন তারা আল-জাইতুনে ফিরে আসেন, তখন তাদের ফেলে আসা বাড়িটি কেবল ধ্বংসস্তূপের স্তূপ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ফিদা হাজি আল জাজিরাকে জানান যে তার প্রিয়জনরা এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন—এই চিন্তা প্রতিদিন তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়। তার মতে, প্রিয়জন হারানোর চেয়ে বড় কষ্ট হলো তাদের বিদায় জানাতে না পারা এবং কবর দিতে না পারার বেদনা, যা শোককে যেন এক অনন্ত অনিশ্চয়তায় আটকে রেখেছে।
সম্প্রতি ফিদার ভাইয়ের সহায়তায় আদনানের মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয় এবং আল-শিফা হাসপাতালের আঙিনায় তাকে দাফন করা হয়। তবে পরিবারের অন্য সদস্যদের ক্ষেত্রে এখনো সেই সুযোগ আসেনি। চলতি বছরের ১ জুলাই হাজি পরিবার পুনরায় ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা প্রিয়জনদের দেহ উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। ভারী খননযন্ত্র বা যন্ত্রপাতির অভাব থাকা সত্ত্বেও তারা ছয়টি দেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। দুই বছর অতিবাহিত হওয়ার কারণে ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া দেহাবশেষ শনাক্ত করা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়েছে, যা পরিবারটির মানসিক যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
গাজার সিভিল ডিফেন্সের তথ্যমতে, এখনো হাজার হাজার মৃতদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। উদ্ধার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ভারী সরঞ্জামের তীব্র সংকট রয়েছে। মানবিক সাহায্যকারী সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে যে মৃতদেহ উদ্ধারে এই দীর্ঘসূত্রতা পরিবারের সদস্যদের ওপর মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলছে। তারা একে অভিহিত করছেন এক ধরনের স্থগিত শোক হিসেবে, যেখানে প্রিয়জনরা একদিকে অনুপস্থিত এবং অন্যদিকে উপস্থিত—কাউকে মাটি দেওয়া হয়নি, কারো জন্য শেষ বিদায়টুকুও জানানো যায়নি।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের পরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা জানিয়েছেন যে এই মানবিক সংকট কেবল একটি পরিবারের নয়, বরং এটি সমগ্র গাজার এক জটিল সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়। দীর্ঘ সময় পার হওয়ার কারণে দেহাবশেষগুলো পচনের ফলে শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে, যা শোকাতুর পরিবারগুলোর জন্য নতুন এক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে স্বজনদের ফেলে আসার এই ক্ষত প্রতিদিন নতুন করে তাদের তাড়া করে ফিরছে এবং ন্যায়বিচার ও শেষ বিদায়ের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে গাজার প্রতিটি শোকাতুর পরিবার।
