আশি দশকের ফ্যাশন দুনিয়ায় হয়েট রিচার্ডস ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করা এই তরুণ যেমন ছিলেন সুপুরুষ, তেমনি ছিলেন বিশ্বখ্যাত ডিজাইনারদের বিজ্ঞাপন প্রচারণার প্রধান মুখ। রালফ লরেন বা ডোনা করানের মতো ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করা হয়েট রিচার্ডসকে বলা হতো বিশ্বের প্রথম পুরুষ সুপারমডেল। বাইরে থেকে তার জীবন ছিল গ্ল্যামার ও খ্যাতির মোড়কে ঢাকা। কিন্তু আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অন্য বাস্তবতা। ক্যামেরা থেকে দূরে তিনি ছিলেন ইটারনাল ভ্যালুস নামক এক রহস্যময় ও অন্ধকারাচ্ছন্ন আধ্যাত্মিক কাল্টের অনুসারী। সম্প্রতি এইচবিও-তে মুক্তি পাওয়া ডকুমেন্টারি সিরিজ ব্রিং মি দ্য বিউটিস: এ মডেল কাল্ট-এ এই ঘটনাটি নতুন করে সামনে এসেছে।
ইটারনাল ভ্যালুস কাল্টের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ফ্রেডরিক ভন মিয়েরারস। নিউ ইয়র্কের উচ্চবিত্ত সমাজে ঘোরাফেরা করা এই ব্যক্তি নিজেকে দাবি করতেন এক ভিন্ন গ্রহের অধিবাসী হিসেবে। তার ভাষ্যমতে, তিনি আর্কটুরস গ্রহ থেকে আসা এক সত্তা, যিনি মানব শরীরে প্রবেশ করেছেন পৃথিবীতে সত্যের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। তার প্রধান কাজ ছিল মানুষের ভেতর থেকে নেতা খুঁজে বের করা, কারণ ১৯৯৯ সালে পৃথিবীতে বড় ধরনের মেরু পরিবর্তন ঘটবে এবং পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। ডুমসডে কাল্ট বা পৃথিবী ধ্বংসের ভয় দেখানো এই গোষ্ঠীর মূল ভিত্তি ছিল গ্ল্যামার ও আধ্যাত্মিকতার সংমিশ্রণ। ভন মিয়েরারস জানতেন, কীভাবে মডেল ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণদের আকৃষ্ট করতে হয়।
ফ্রেডরিক ভন মিয়েরারসের আসল নাম ছিল ফ্রেড মেয়ার্স, যিনি ব্রুকলিনের এক সাধারণ শ্রমজীবী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু উচ্চবিত্তদের সমাজে পরিচিতি পাওয়ার জন্য তিনি নিজের ইতিহাস ও পরিচয় সম্পূর্ণ বদলে ফেলেন। তিনি ব্যক্তিগত সাইকিক রিডিং বা আধ্যাত্মিক জীবনের পড়ার নামে ক্যাসেট টেপ বিক্রি করতেন এবং দামী পাথরের ব্যবসায় জড়াতেন। জ্যাকুয়েলিন অ্যাডামস নামে তৎকালীন এক জনপ্রিয় মডেল এই কাল্টের খপ্পরে পড়ে তাকে এক লক্ষ ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছিলেন। ভন মিয়েরারস দাবি করতেন যে তার পাথরগুলোতে নিরাময় ক্ষমতা রয়েছে। অথচ এই অর্থ দিয়ে তিনি নিজের অ্যাপার্টমেন্টের সংস্কার করাতেন।
হয়েট রিচার্ডস যখন এই কাল্টের সঙ্গে যুক্ত হন, তখন তার বয়স ছিল মাত্র ষোলো বছর। ম্যাসাচুসেটসের এক সমুদ্র সৈকতে ভন মিয়েরারস তাকে প্রথম টার্গেট করেন। রিচার্ডসের ভাষ্যমতে, ভন মিয়েরারস তাকে সবসময় বোঝাতেন যে তিনি অন্যদের থেকে আলাদা এবং বিশেষ। এই প্রশংসা তাকে এমনভাবে সম্মোহিত করেছিল যে তিনি নিজের পরিবারের সাথে প্রায় বারো বছর কোনো যোগাযোগ রাখেননি। রিচার্ডস নিজে কোনো শারীরিক বন্দী ছিলেন না, কিন্তু মানসিক দিক থেকে তিনি ভন মিয়েরারসের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। মিলান বা ম্যানহাটনে মডেলিংয়ের কাজে ব্যস্ত থাকলেও তিনি মানসিকভাবে এই কাল্টের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেননি।
মানসিক গোলামির এই অধ্যায়টি কেবল হয়েট রিচার্ডসের জীবনের গল্প নয়, এটি একটি বড় ধরনের মনস্তাত্ত্বিক কৌশলের দৃষ্টান্ত। অনেক সময় মনে করা হয়, কাল্টের শিকার কেবল দুর্বল বা অসহায় ব্যক্তিরাই হন। কিন্তু এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বুদ্ধিদীপ্ত এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিদেরও এমন কাল্টের জালে ফাঁসানো সম্ভব। ভন মিয়েরারস নিজেকে একজন অভিজাত পরিবারের মানুষ হিসেবে পরিচয় দিতেন এবং তিনি কখনোই নিজের শিক্ষা বা অতীত সম্পর্কে পরিষ্কার করে কিছু বলতেন না। তিনি এমন এক কৃত্রিম ব্যক্তিত্ব তৈরি করেছিলেন, যা দীর্ঘ বারো বছর কেউ ধরতে পারেনি।
হয়েট রিচার্ডস অবশেষে ১৯৯৯ সালে তার সতীর্থ সুপারমডেল ফ্যাবিও ল্যানজোনির সহায়তায় এই কাল্ট থেকে নিজেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হন। ততদিনে ভন মিয়েরারস এইডসের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু মৃত্যুর পরও তার তৈরি কাল্টের প্রভাব দীর্ঘদিন রয়ে গিয়েছিল। এখন ৬৪ বছর বয়সী হয়েট রিচার্ডস মনে করেন, তার এই অভিজ্ঞতা জনসমক্ষে আনা জরুরি। তিনি এখন পাবলিক স্পিকার হিসেবে কাজ করছেন এবং তরুণদের সতর্ক করছেন যেন তারা এমন কোনো ভ্রান্ত আধ্যাত্মিক গোষ্ঠীর খপ্পরে না পড়েন।
এই ঘটনা আমাদের শেখায় যে, খ্যাতির শিখরে থাকা ব্যক্তিদেরও মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদে ফেলা সম্ভব। ভন মিয়েরারস কেবল অর্থ উপার্জনই করেননি, তিনি মানুষের বিশ্বাস নিয়ে খেলেছিলেন। আজ যখন আমরা পেছন ফিরে তাকাই, তখন বুঝতে পারি যে গ্ল্যামারের নিচে লুকিয়ে থাকা অন্ধকার কতটা ভয়ংকর হতে পারে। হয়েট রিচার্ডসের পঁচিশ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রা কেবল নিজের মুক্তি পাওয়ার গল্প নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে চারপাশের ঝকঝকে জগতের ভেতরেই হয়তো লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার জগত। কাল্টের এই ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা রিচার্ডস এখন এক নতুন জীবনের পথে হাঁটছেন, যেখানে সত্যের কোনো মিথ্যে মোড়ক নেই।
