বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট, ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

গাজায় যুদ্ধবিরতির ৩০০ দিনে নিহত অন্তত ৩০০ শিশু

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ৬, ২০২৬, ০৯:৩০ পিএম

গাজায় যুদ্ধবিরতির ৩০০ দিনে নিহত অন্তত ৩০০ শিশু

জাতিসংঘ শিশু তহবিল বা ইউনিসেফ বৃহস্পতিবার এক সরকারি বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছে যে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ঘোষিত কথিত যুদ্ধবিরতির পর থেকে গাজা উপত্যকায় কমপক্ষে তিনশ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে, আল জাজিরা ও এপি নিউজ জানিয়েছে। ভয়াবহ এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত প্রায় তিনশ দিনের সামরিক সংঘাতে প্রতিদিন গড়ে একজন করে শিশু প্রাণ হারিয়েছে। একই সময়ে আরও কয়েকশ শিশু গুরুতরভাবে আহত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো তাদের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ করেছে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাতের কারণে ওই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার বেসামরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় শিশুদের জীবন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার জন্য ইউনিসেফের আঞ্চলিক পরিচালক এডুয়ার্ড বেইগবেডার এই অমানবিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, এমন একটি যুদ্ধবিরতি যা প্রতিদিন গড়ে একজন করে শিশুর মৃত্যু ডেকে আনে, তা মূলত শিশুদের ন্যূনতম নিরাপত্তা দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। গাজার শিশুরা এখনও প্রতিশ্রুত সেই সহিংসতামুক্ত জীবনের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় প্রহর গুনছে বলে তিনি তার আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন। সংস্থাটির মতে, যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক শান্তি পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত সকল পক্ষকে এখন শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিশুদের সুরক্ষায় বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

বর্তমানে গাজার অবরুদ্ধ এই উপত্যকার মোট ভূখণ্ডের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ ছোট এলাকায় সাধারণ ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। বাস্তুচ্যুত এই বিশাল জনগোষ্ঠী এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত আবাসিক ভবন, কংক্রিটের বিশাল স্তূপ এবং পরিষ্কার না করা বিপজ্জনক বর্জ্যের মাঝেই অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছে। নিরাপদ আশ্রয়ের তীব্র অভাব এবং চরম মাত্রায় ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশের কারণে সেখানে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর বর্তমান পরিবেশ শিশুদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য একেবারেই অনুপযোগী এবং প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।

আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে থাকা শিশুরা বর্তমানে তীব্র অপুষ্টি এবং নানা ধরনের সংক্রামক পানিবাহিত ব্যাধির চরম ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশুদ্ধ পানীয় জলের সম্পূর্ণ অভাব এবং ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে পরিস্থিতি দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। পর্যাপ্ত সাধারণ চিকিৎসার অভাবে সাধারণ রোগগুলোও এখন প্রতিরোধ ক্ষমতার অভাবে শিশুদের জন্য নিশ্চিত মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করে বলেছে যে প্রয়োজনীয় জরুরি ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশের অনুমতি না দিলে মানবিক বিপর্যয় আরও কয়েকগুণ ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

হাসপাতালগুলোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি উদ্বেগজনক ও হৃদয়বিদারক পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য কাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সংকটের কারণে শিশু ওয়ার্ডগুলোতে ইনকিউবেটরের মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। ইউনিসেফের সর্বশেষ তথ্যমতে, অপরিণত নবজাতকদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য বর্তমানে একটি ইনকিউবেটর যন্ত্র একাধিক শিশুর জন্য ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন অসহায় চিকিৎসকরা। চিকিৎসা ব্যবস্থার এই সম্পূর্ণ ধসের কারণে প্রতিদিন অসংখ্য নবজাতক বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুর মুখে পড়ছে। বিদ্যুৎ ও পরিচ্ছন্ন চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে ব্যথানাশক ছাড়াই অনেক গুরুতর আহত শিশুর অস্ত্রোপচার করতে হচ্ছে।

দীর্ঘস্থায়ী এই মানবিক বিপর্যয়ের মাঝে শিশুদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরব ভূমিকা নিয়ে নানা মহলে তীব্র সমালোচনা অব্যাহত রয়েছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো, চলমান এই রাজনৈতিক ও সামরিক অচলাবস্থার মাঝে ঠিক কীভাবে শিশুদের জন্য নিরাপদ মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ সুনিশ্চিত করা সম্ভব হবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই উপত্যকায় বেঁচে থাকা শিশুদের ভয়াবহ শারীরিক ও মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে আগামী দিনে কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, তা নিয়েও বিশ্বনেতারা কোনো সুস্পষ্ট ও কার্যকর রূপরেখা এখনো নির্ধারণ করতে পারেননি।

banner
Link copied!