বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট, ২০২৬, ২২ শ্রাবণ ১৪৩৩

উয়েফার ফিফা বয়কট বহাল: সিদ্ধান্তে অনড় ইউরোপ

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ৬, ২০২৬, ০৯:২১ পিএম

উয়েফার ফিফা বয়কট বহাল: সিদ্ধান্তে অনড় ইউরোপ

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বিশ্বকাপসহ অন্যান্য বড় প্রতিযোগিতার আংশিক মালিকানা বিক্রির বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে শেষ পর্যন্ত সরে আসলেও তাদের বয়কট কর্মসূচি বহাল রাখার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা। আল জাজিরা এবং রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার উয়েফার পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় স্পষ্ট জানানো হয়েছে যে, ফিফা তাদের মূল শর্তগুলো পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ফলে বৈশ্বিক ফুটবলে ফিরে আসার জন্য এখনই কোনো ধরনের আপস বা সমঝোতায় যাচ্ছে না ইউরোপের ৫৫টি সদস্য দেশ। বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এমন প্রকাশ্য বিভাজন আগে খুব কমই দেখা গেছে।

গত সপ্তাহে ইনফান্তিনো যখন প্রথম ঘোষণা করেন যে ফিফা তাদের অত্যন্ত লাভজনক বৈশ্বিক প্রতিযোগিতাগুলোর মালিকানার একটি অংশ তৃতীয় পক্ষের কাছে বিক্রি করতে চায়, তখন ফুটবল বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর প্রতিবাদে উয়েফার সদস্য দেশগুলো সর্বসম্মতিক্রমে ফিফার সমস্ত ইভেন্ট থেকে নিজেদের অবিলম্বে প্রত্যাহার করার পক্ষে ভোট দেয়। ইউরোপীয় দেশগুলোর এই নজিরবিহীন ও ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের পর বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভ্যন্তরে ব্যাপক চাপের মুখে পড়েন ফিফা সভাপতি। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয়ে তিনি গত বুধবার মরক্কোয় অনুষ্ঠিত এক জরুরি সভায় সেই মালিকানা বিক্রির প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেন। একই সভায় ফিফার শীর্ষ নেতৃত্ব ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে পরিস্থিতি শান্ত করার একটি দৃশ্যমান চেষ্টা করে।

তবে ফিফার এই আকস্মিক পিছু হটার ঘটনাকে মোটেও যথেষ্ট মনে করছে না উয়েফা। সংস্থাটির পক্ষ থেকে দেওয়া এক কড়া লিখিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইনফান্তিনোর শুধু বিতর্কিত প্রস্তাব প্রত্যাহার করাই তাদের একমাত্র শর্ত ছিল না। উয়েফার সদস্য দেশগুলো তাদের শর্তের বিষয়ে শুরু থেকেই অত্যন্ত পরিষ্কার ও দৃঢ় ধারণা দিয়েছিল। প্রথমত, বড় প্রতিযোগিতাগুলো বিক্রির প্রস্তাব চিরতরে বাতিল করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতে কখনোই ফুটবল খেলাকে এভাবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে বিকৃত করার কোনো অপচেষ্টা করা হবে না, এমন সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। উয়েফার নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, এই শর্তগুলো এখনো পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পূরণ করা হয়নি।

বিবৃতিতে উয়েফা আরও বেশি স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে তারা জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সভাপতিত্ব ও নেতৃত্বের ওপর থেকে পুরোপুরি আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। শনিবার দেওয়া তাদের পূর্ববর্তী অবস্থানের বিন্দুমাত্র কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে। ফিফা সভাপতির অধীনে কাজ করা কিছু বেতনভুক্ত কর্মকর্তা তাকে সমর্থন করলেই বর্তমান বাস্তব পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয় না বলে উয়েফা তাদের বিবৃতিতে সরাসরি উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, যাদের ব্যক্তিগত কর্মজীবন সরাসরি ফিফা সভাপতির অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল, তাদের অন্ধ সমর্থন মূল প্রশাসনিক সংকট সমাধানে কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে না।

এই দ্বন্দ্বের মূল কারণ হিসেবে ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে ক্ষমতা এবং অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ। ইউরোপীয় ফুটবল সংস্থা বরাবরই নিজেদের টুর্নামেন্টগুলোর স্বকীয়তা বজায় রাখতে চেয়েছে। অন্যদিকে ফিফা চাচ্ছে নতুন বিনিয়োগকারীদের এনে বৈশ্বিক টুর্নামেন্টগুলোর পরিধি আরও বৃদ্ধি করতে। উয়েফার আশঙ্কা, তৃতীয় পক্ষের কাছে শেয়ার বিক্রি করলে ফুটবলের মূল চেতনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

যা কম স্পষ্ট তা হলো, ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী মহাদেশ ইউরোপকে বাদ দিয়ে ফিফা কীভাবে তাদের আগামী বিশ্বকাপ এবং অন্যান্য বৈশ্বিক টুর্নামেন্টগুলো আয়োজন করার বাস্তব পরিকল্পনা করছে। উয়েফার এই অব্যাহত কঠোর অবস্থানের কারণে বিশ্ব ফুটবলের প্রশাসনিক কাঠামোতে একটি গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন সৃষ্টি হয়েছে। ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলো, নামিদামি ফুটবল ক্লাব এবং তারকা খেলোয়াড়রা যদি দীর্ঘমেয়াদে এই বয়কটের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন, তবে ফিফার জন্য একটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত সংকট তৈরি হতে পারে। বিস্তারিত তথ্য এখনো সামনে আসছে, তবে বর্তমান এই অভূতপূর্ব পরিস্থিতি বৈশ্বিক ফুটবলের ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় ধরনের অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা তৈরি করেছে।

banner
Link copied!