কলম্বিয়ায় গত সোমবার আঘাত হানা ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানির পর দেশটিতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে, আল জাজিরা ও রয়টার্স জানিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীদের প্রাণপণ চেষ্টার মধ্যেই বুধবার দেশটির সরকার জানিয়েছে, নিহতদের প্রতি সম্মান জানাতে দেশের সব সরকারি ভবন ও বিশ্বজুড়ে কলম্বিয়ার দূতাবাসগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।
গত এক শতাব্দীর মধ্যে দেশটিতে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী এই ভূমিকম্পে কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার ভবন ধসে পড়েছে এবং রাস্তাঘাট ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ১০০টিরও বেশি পরাঘাত বা আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলিয়ার্দো দে লা এসপ্রিয়েয়ার জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যিনি ভূমিকম্পের মাত্র তিন দিন আগে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের পর দায়িত্ব নেওয়া এই নতুন প্রেসিডেন্ট তার মেয়াদের শুরুতেই এমন এক ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়লেন।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এই ঘটনায় দুই হাজার পাঁচশো পঁচানব্বই জন আহত হয়েছেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৫ জনের নিখোঁজ হওয়ার কথা জানানো হয়েছে। তবে বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত ডেটাবেসগুলোর তথ্যমতে, নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা প্রায় চার হাজারের কাছাকাছি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিপর্যয়ের তৃতীয় দিনে প্রবেশ করায় আটকে পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধারের সময় ফুরিয়ে আসছে। ত্রাণ সংস্থাগুলো বলছে, ভেঙে পড়া ভবনের নিচে আটকে থাকাদের উদ্ধারের ক্ষেত্রে প্রথম ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যদিও পানি ও খাবারের সুবিধা থাকলে কেউ কেউ এর চেয়েও বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারেন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোর মধ্যে কালি, পেরেইরা, মানিজালেস এবং কিবদোর নাম উঠে এসেছে। এসব এলাকায় উদ্ধারকর্মীরা সারা রাত ধরে উদ্ধার কাজ চালিয়েছেন। কালি ও পেরেইরায় ক্রেন, সন্ধানী কুকুর এবং ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের পাশাপাশি সাধারণ স্বেচ্ছাসেবকরা খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ করছেন। কালিতে আবাসিক ভবনগুলো ধসে পড়ে আস্ত পাড়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, যেখানে একসময় বহুতল ভবন ছিল সেখানে এখন কেবল কংক্রিটের স্তূপ। স্থানীয় বাসিন্দারা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের সঙ্গে মিলে শাবল ও বেলচা দিয়ে উদ্ধারকাজে হাত লাগিয়েছেন এবং প্রাণের স্পন্দন শুনতে মাঝে মাঝে সব কাজ থামিয়ে দিচ্ছেন।
গ্রামাঞ্চলের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছে অবস্থিত চোকো অঞ্চলটি দেশের অন্যতম দরিদ্র এলাকা। সেখানকার অনেক জনবসতিতে কেবল নৌকা বা আকাশপথে পৌঁছানো সম্ভব। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে ওইসব দুর্গম এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। এই বিপর্যয়ে কলম্বিয়ার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাও চরম চাপের মুখে পড়েছে। কালির একটি হাসপাতালের একাংশ ধসে পড়ায় চিকিৎসকরা রোগীদের পার্কিং লটে সরিয়ে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে চিকিৎসা দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রেসিডেন্ট এসপ্রিয়েয়া দেশটিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন এবং বাড়ি হারানো পরিবারগুলোকে ভাড়ায় ভর্তুকি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সাধারণ কলম্বিয়ানরাও দুর্গতদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছেন। হাজার হাজার মানুষ খাবার, পানি ও অন্যান্য সামগ্রী নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে হাজির হচ্ছেন এবং রক্তদান কেন্দ্রগুলোতে লম্বা লাইন দেখা গেছে। এদিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জরুরি সহায়তা হিসেবে এক কোটি পঞ্চান্ন লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এর পাশাপাশি লস অ্যাঞ্জেলেস ও ভার্জিনিয়া থেকে বিশেষায়িত নগর উদ্ধারকারী দল পাঠানো হচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তেইশ লাখ ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং মেক্সিকো ও এল সালভাদর উদ্ধারকর্মীসহ ১০০ টন ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
