সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬, ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

গাজায় নিহত সাংবাদিকদের স্মরণে ওয়ায়েল আল দাহদুহের আবেগঘন বার্তা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ১০, ২০২৬, ০৯:৪০ পিএম

গাজায় নিহত সাংবাদিকদের স্মরণে ওয়ায়েল আল দাহদুহের আবেগঘন বার্তা

গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় নিহত আল জাজিরার প্রখ্যাত সংবাদদাতা আনাস আল শরিফ এবং তার সহকর্মীদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে এক আবেগঘন ও বিশ্লেষণী স্মৃতিচারণ প্রকাশ করেছেন আল জাজিরার গাজা ব্যুরো প্রধান ওয়ায়েল আল দাহদুহ। সোমবার প্রকাশিত এক বিশেষ নিবন্ধে তিনি ফিলিস্তینی সাংবাদিকদের অসামান্য সাহসিকতা, পেশাদারিত্ব এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অব্যাহত নীরবতার চিত্র তুলে ধরেন। আল জাজিরা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিগত বছরগুলোতে গাজায় অন্তত দুই শত পঁয়ষট্টি জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন, যা আধুনিক সাংবাদিকতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

ওয়ায়েল আল দাহদুহ তার নিবন্ধে স্মরণ করেন যে কীভাবে দুই হাজার পঁচিশ সালের দশই আগস্ট গাজা শহরের আল শিফা হাসপাতালের সামনে স্থাপন করা আল জাজিরার সংবাদ কর্মীদের তাঁবুতে সরাসরি বিমান হামলা চালায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। সেই ভয়াবহ হামলায় আল জাজিরার উদীয়মান ও সাহসী সংবাদদাতা আনাস আল শরিফ, প্রতিনিধি মোহাম্মদ কুরাইকে, চিত্রগ্রাহক মোহাম্মদ নুফাল ও ইব্রাহিম জাহের সহ একাধিক গণমাধ্যমকর্মী ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। উত্তরাঞ্চলীয় গাজায় দীর্ঘ সময় ধরে অবরুদ্ধ ও চরম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও সততা ও সাহসের সাথে তথ্য তুলে ধরার মাধ্যমে আনাস আল শরিফ বিশ্বজুড়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

সংবাদ সংস্থাগুলোর পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে গাজায় কর্মরত স্থানীয় সাংবাদিকেরা কেবল সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেননি, বরং তারা নিজেরাই প্রত্যক্ষ গণহত্যার শিকার হয়েছেন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী গাজা উপত্যকাকে বাইরের বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে বিদ্যুৎ, পানি, খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ বন্ধ করে দেয় এবং একই সাথে বিদেশী সাংবাদিকদের সেখানে প্রবেশে কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে গাজার স্থানীয় ফিলিস্তینی সাংবাদিকেরাই বহির্বিশ্বের জন্য একমাত্র চোখ ও কান হিসেবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবিরাম কাজ করে গেছেন। তাদের নিজেদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং স্বজনেরা প্রাণ হারিয়েছেন।

ওয়ায়েল আল দাহদুহ তার ব্যক্তিগত জীবনের করুণ অভিজ্ঞতা ও সহকর্মী সামের আবু দাক্কার মর্মান্তিক শাহাদাতের কথা স্মরণ করে জানান যে আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের মাধ্যমে আগাম অনুমোদন নিয়ে সংবাদ সংগ্রহে গিয়েও তারা ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হয়েছিলেন। প্রেস লেখা ভেস্ট ও হেলমেট গাজায় সুরক্ষার বদলে উল্টো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ইসরায়েল কর্তৃক সাংবাদিকদের ওপর ধারাবাহিক আক্রমণের পরও জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বশক্তির নীরবতাকে তিনি গভীর দুঃখজনক বলে অভিহিত করেন। যা কম স্পষ্ট তা হলো, আন্তর্জাতিক বিচারিক ব্যবস্থা কখন এসব অপরাধের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করবে।

গাজার সাংবাদিক সমাজ আধুনিক যুগে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যমের সংজ্ঞাকে নতুন করে রূপায়ন করেছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়। চরম অনিশ্চয়তা ও মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও সাংবাদিকেরা সত্য প্রকাশের যে নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব পালন করেছেন, তা বিশ্বের সকল গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য এক চিরন্তন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে। ওয়ায়েল আল দাহদুহ স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেন যে ঘাতকদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত না করা হলে বিশ্ব দরবারে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিষ্ক্রিয়তার কারণে এসব বীর সাংবাদিকদের বারবার হত্যা করা হচ্ছে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

banner
Link copied!