আসন্ন নির্বাচন ও এর নিরপেক্ষতা নিয়ে ইসরায়েলে তীব্র উদ্বেগ ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে বলে আল জাজিরা এবং টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আগামী অক্টোবর মাসের ২৭ তারিখে নির্ধারিত এই সাধারণ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে চরম অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা নির্বাচনে সম্ভাব্য কারচুপি ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। বর্তমান সরকারের বিতর্কিত নীতি এবং বিচার বিভাগের ক্ষমতা খর্ব করার পদক্ষেপগুলো দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে এক গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে উঠে এসেছে যে, দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ ইহুদি নাগরিক আসন্ন নির্বাচন এবং এর স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর আশঙ্কায় ভুগছেন। দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের সুস্পষ্ট অভিযোগ উঠেছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ নাগরিকদের একটি বড় অংশ দেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা নিয়ে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতের প্রধান এবং কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যানের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক টেলিভিশন ভাষণে নির্বাচনকালীন সহিংসতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে নির্বাচন কোনোভাবেই কোনো গৃহযুদ্ধ নয় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মী ও প্রার্থীদের কোনো অবস্থাতেই নির্ধারিত সীমা বা লাল রেখা অতিক্রম করা উচিত নয়। তিনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের শত্রু হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়ে সবাইকে সংযত থাকার অনুরোধ জানান।
বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারাও বর্তমান প্রশাসনের বিরুদ্ধে নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে নিজেদের অনুকূলে প্রভাবিত করার নানামুখী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিশিষ্ট রাজনীতিকরা সরকারের এই ধরনের কর্তৃত্ববাদী আচরণের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন যে এটি গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বিশেষ করে কাসিফসহ বিভিন্ন বিরোধী দলের আইনপ্রণেতারা জানিয়েছেন যে নির্বাচনে ফিলিস্তিনি নাগরিক ও বামপন্থী দলগুলোর ভোটারদের অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানান প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করা হচ্ছে।
এদিকে ক্ষমতাসীন ডানপন্থী জোটের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার এবং সম্ভাব্য বিদেশি হস্তক্ষেপের মতো গুরুতর ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না দেওয়ায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। এর পাশাপাশি বিদেশে বসবাসরত বিরোধী মতের নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট তৈরির অপচেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যা গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে আরও বেশি বিতর্কিত করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে, আগামী অক্টোবরের এই নির্বাচন কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব এবং নীতিগত নৈতিকতার এক চূড়ান্ত পরীক্ষা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কড়া নজরদারির মুখে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সরকার কীভাবে এই নির্বাচনি বৈতরণী পার হয় এবং দেশের ভেতরে ও বাইরে তৈরি হওয়া অনাস্থা দূর করতে কী পদক্ষেপ নেয়, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন বিশ্ব রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা।
