মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত গাজার পনেরো দফার শান্তি পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি রবিবার স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাস সম্পূর্ণরূপে অস্ত্রহীন না হওয়া পর্যন্ত গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার করা হবে না, রয়টার্স ও বিবিসি নিউজের প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পিস বোর্ড বা শান্তি পর্ষদের তৈরি করা এই চুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল হামাসসহ গাজার অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করা। এর বিনিময়ে চুক্তিতে গাজা থেকে ধাপে ধাপে ইসরায়েলি বাহিনীর প্রত্যাহার এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত উপত্যকাটির পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু করার কথা বলা হয়েছিল।
রবিবার অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বক্তব্য রাখার সময় নেতানিয়াহু তার সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন যে, ইসরায়েল পনেরো দফার এই নথিটি সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, হামাস সত্যিকার অর্থে নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী কোনোভাবেই সেনা প্রত্যাহার করবে না। একই সাথে ইসরায়েলি নাগরিক ও বাহিনীর বিরুদ্ধে থাকা সব ধরনের হুমকি নস্যাৎ করার অভিযান অব্যাহত থাকবে।
নেতানিয়াহু আরও বলেন, হামাসকে নিরস্ত্র করার অর্থ হলো কোনো কাল্পনিক নিরস্ত্রীকরণের বদলে তাদের বাস্তব ও দৃশ্যমান নিরস্ত্রীকরণ। তিনি জানান, হামাসের সকল প্রকার সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে নির্মূল না করা পর্যন্ত তাদের এই অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে।
ওয়াশিংটনের সাথে চলমান আলোচনার বিষয়টি স্বীকার করে নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে তারা এখন ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছেন। মার্কিনীদের দেওয়া কিছু প্রস্তাব তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হলেও বেশ কিছু বিষয় ইসরায়েলের কাছে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। ইসরায়েল এ ধরনের বিষয়ে নিজেদের অবস্থানে দৃঢ় থাকতে জানে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস আগে এই নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনায় সম্মতি জানালেও তাদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট শর্ত দেওয়া হয়েছিল। তারা জানিয়েছিল, ভারী অস্ত্রশস্ত্র হস্তান্তরের বিষয়টি তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন ইসরায়েল গাজায় সব ধরনের আগ্রাসন বন্ধ করবে। পাশাপাশি গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা পুরোপুরি প্রত্যাহার করতে হবে।
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ক্ষেত্রে নেতানিয়াহু বর্তমানে তার ডানপন্থী জোটের প্রবল চাপে রয়েছেন। ইসরায়েলে আগামী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি থাকায়, প্রধানমন্ত্রী তার মিত্রদের অসন্তুষ্ট করে এমন কোনো রাজনৈতিক ছাড় দিতে রাজি নন। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির এই চুক্তির খসড়াকে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য বলে উড়িয়ে দিয়েছেন এবং গাজা পরিকল্পনা সম্পূর্ণ বাতিল করতে মন্ত্রিসভায় নতুন করে ভোটের দাবি তুলেছেন।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রথম ঘোষণা করা এই শান্তি চুক্তির অগ্রগতি নিয়ে গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশংসা করেছিলেন। তিনি জানিয়েছিলেন যে, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির বিষয়টি দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তার দিকে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। চুক্তির বাস্তবায়ন তদারকি করার জন্য পিস বোর্ড গঠনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল।
গত বছরের অক্টোবরে একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পরও ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় প্রায় প্রতিদিনই ব্যাপক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। নেতানিয়াহু কর্তৃক মার্কিন এই শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার ঘটনাটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য একটি বড় ধাক্কা। যা কম স্পষ্ট তা হলো, ইসরায়েলি নির্বাচনের ঠিক আগে এ ধরনের সরাসরি প্রত্যাখ্যানের পর মার্কিন প্রশাসন এখন কী পদক্ষেপ নেবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে শান্তি প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে এবং রয়টার্স জানিয়েছে, বিস্তারিত এখনো সামনে আসছে।
