আল জাজিরার একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে নয়াদিল্লিতে হাজার হাজার তরুণের ব্যাপক বিক্ষোভের পর ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, যা যুব রাজনীতির এক গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। গত ২৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে ধর্মেন্দ্র প্রধানের এই আকস্মিক পদত্যাগ ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ভারতীয় রাজনীতিক এবং জননীতি বিশ্লেষক সুধাংশু মিত্তাল তার এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, এই বিক্ষোভগুলোকে কেবল সরকার এবং বিরোধীদের মধ্যকার সাধারণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হবে। ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি-এর নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্দোলন মূলত ভারতের নতুন প্রজন্ম কীভাবে রাজনীতি, প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক চুক্তিকে উপলব্ধি করে, তার একটি কাঠামোগত পরিবর্তনেরই বাস্তব প্রতিফলন।
এই তীব্র সামাজিক ক্ষোভের একেবারে কেন্দ্রে ছিল স্নাতক পর্যায়ের মেডিকেল কোর্সে ভর্তির জন্য দেশব্যাপী পরিচালিত ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি-কাম-এন্ট্রান্স টেস্ট বা নিট পরীক্ষার বিশাল কেলেঙ্কারি। যখন দেশজুড়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং উত্তরপত্র মূল্যায়নে ব্যাপক অনিয়মের খবর প্রকাশ্যে আসে, তখন সাধারণ পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তবে এই ক্ষোভ খুব দ্রুতই কেবল সেই নির্দিষ্ট পরীক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি ভারতের কোটি কোটি মধ্যবিত্ত পরিবারের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের মূলে চরম আঘাত হেনেছিল। ভারতের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে শিক্ষা এবং মেধা এখনো অর্থনৈতিক মুক্তির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়। বছরের পর বছর ধরে অভিভাবকরা তাদের জীবনের সমস্ত সঞ্চয় বিনিয়োগ করেন এবং শিক্ষার্থীরা তাদের কৈশোর বিসর্জন দিয়ে একটি পরীক্ষার আশায় জীবন গুছিয়ে নেয়।
যখন রাষ্ট্র পরিচালিত এমন একটি উচ্চ-ঝুঁকির পরীক্ষার সততা সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে, তখন এটি একটি গভীর সম্মিলিত উদ্বেগের জন্ম দেয়। সাধারণ মানুষের মনে এই ভীতির সঞ্চার হয় যে, কেবল কঠোর পরিশ্রম এবং মেধা হয়তো সাফল্যের জন্য আর যথেষ্ট নয়। সুধাংশু মিত্তাল ব্যাখ্যা করেছেন যে, মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর থেকে এই আস্থা হারিয়ে যাওয়া মূলত সাধারণ নাগরিক এবং রাষ্ট্রের মধ্যকার একটি অলিখিত চুক্তির চরম লঙ্ঘন। এই প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে একটি সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তর করতে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
এই আন্দোলনের সূত্রপাত এবং এর রাজনৈতিক রূপান্তর ছিল সম্পূর্ণ অপ্রচলিত এবং অভিনব। ২০২৬ সালের মে মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি শুনানির সময় বেকার যুবক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মীদের আচরণের সমালোচনা করতে গিয়ে তাদের ‘তেলাপোকা’ বা পরজীবীর সাথে তুলনা করেন। এই অবমাননাকর মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়ায় ১৬ মে তারিখে ডিজিটাল যোগাযোগ কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ প্রতিষ্ঠা করেন। আল জাজিরা এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মতে, যা শুরু হয়েছিল বিচারিক অবজ্ঞার একটি ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া হিসেবে, তা খুব দ্রুতই একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। এই অপমানকেই সম্মানের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করে আন্দোলনটি লাখ লাখ হতাশ তরুণের সাথে তাৎক্ষণিকভাবে সংযোগ স্থাপন করতে সক্ষম হয়।
এই নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের পেছনে অভিজিৎ দিপকের সাথে যুক্ত ছিলেন সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা এবং দলের মুখপাত্র রত্না সিং। তারা সকলেই যোগাযোগ, সামাজিক সংঘবদ্ধকরণ এবং আইনের পটভূমি থেকে আসা উচ্চশিক্ষিত তরুণ। কয়েকদিনের মধ্যেই ইনস্টাগ্রামে এই দলটির অনুসারীর সংখ্যা দুই কোটি পঁচিশ লাখ ছাড়িয়ে যায়, যা ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির মতো দেশের সবচেয়ে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর ডিজিটাল উপস্থিতিকে বহুগুণে ম্লান করে দেয়। এই বিস্ময়কর ডিজিটাল উত্থানের পেছনে মূলত ভারতের ভয়াবহ অর্থনৈতিক বাস্তবতা একটি বড় ভূমিকা পালন করেছে। পনেরো থেকে পঁচিশ বছর বয়সী ডিগ্রিধারী তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার যখন চল্লিশ শতাংশে পৌঁছেছে, তখন যুবসমাজ রাষ্ট্রের প্রতি সম্পূর্ণরূপে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল। ফাঁস হওয়া পরীক্ষাগুলো ছিল সেই দীর্ঘস্থায়ী পদ্ধতিগত ত্রুটি এবং স্থবির কর্মজীবনের এক চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
আন্দোলনটি দ্রুত ডিজিটাল জগত থেকে রাজপথে নেমে আসে। ৬ জুন থেকে যন্তর মন্তরে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস ফেডারেশন এবং স্টুডেন্টস ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ার মতো বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোও স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দেয়। বিশিষ্ট অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক ২৮ জুন থেকে অনশন শুরু করলে আন্দোলনটি জাতীয় মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। সিজেপি প্রতিনিধিরা ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডার সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো তুলে ধরেন। তাদের মূল দাবির মধ্যে ছিল শিক্ষামন্ত্রীর তাৎক্ষণিক পদত্যাগ, পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার এবং পরীক্ষার অস্থিরতার কারণে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য এক কোটি রুপি করে আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদান।
আন্দোলনটি ২০ জুলাই তারিখে চরম আকার ধারণ করে, যাকে তারা ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচি হিসেবে ঘোষণা করেছিল। পুলিশের কঠোর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবনের দিকে বিশাল পদযাত্রা শুরু করে। রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত কঠোর এবং দমনমূলক। নিরাপত্তা বাহিনী ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে ব্যাপকভাবে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ চালায়, যার ফলে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম সহিংস সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। দিল্লির রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে বহু বিক্ষোভকারী এবং পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসা নেন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে একটি বিশেষ চাঞ্চল্যকর ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর একে-৪৭ অ্যাসল্ট রাইফেল থেকে গুলি চালানোর অভিযোগে এক ভারতীয় পুলিশ কর্মকর্তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করা হয়।
কঠোর দমন-পীড়ন আন্দোলনকে থামাতে ব্যর্থ হয়; উল্টো এটি ব্যাপক বৈশ্বিক সংহতি অর্জন করে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থুনবার্গ লন্ডনে ভারতের ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনে একটি বিশাল সমাবেশে যোগ দেন। ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ভারত সরকার শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়। ২৫ জুলাই ধর্মেন্দ্র প্রধান তার পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং সরকার প্রহ্লাদ জোশীকে নতুন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পরবর্তীতে এই পরিস্থিতির বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন যে, তিনি ওইসব শিক্ষার্থীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন যারা তার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল এবং তিনি তাদের ‘বিপথগামী শিশু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আইনগত দিক থেকেও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং পরীক্ষায় জালিয়াতি বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িতদের জন্য শাস্তির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়। তবে মিত্তাল তার বিশ্লেষণে যুক্তি দিয়েছেন যে, সরকারের এই তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াগুলোর চারপাশের রাজনৈতিক নাটকীয়তা প্রায়শই প্রাতিষ্ঠানিক আস্থার প্রকৃত সংকটকে আড়াল করার চেষ্টা করে। ভারতের এই সিজেপি আন্দোলন মূলত জেনারেশন জেডের গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে নতুন আকার দেওয়ার একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক কাঠামোরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। হংকংয়ের প্রত্যর্পণ বিরোধী আন্দোলন, ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্ট বিক্ষোভ, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলন এবং চিলির বিক্ষোভ থেকে শুরু করে সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে যে, তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনগুলো এখন আর ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক দলের ওপর নির্ভরশীল নয়।
যা কম স্পষ্ট তা হলো, সরকারগুলো এই নতুন বাস্তবতাকে কতটা দ্রুত গ্রহণ করতে পারবে। এই নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীরা ডিজিটালভাবে অত্যন্ত সংযুক্ত এবং তারা প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি গভীরভাবে সন্দিহান। তারা দাবি করে যে, মেধা রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাগুলোকে কেবল ন্যায্যভাবে কাজ করলেই চলবে না, বরং তাদের কার্যক্রমে পূর্ণ স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করতে হবে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো তাদের প্রকৃত জনদুর্ভোগগুলো স্বীকার করে নেওয়ার এবং সেগুলো নিয়মতান্ত্রিকভাবে সমাধান করার ক্ষমতার মাধ্যমেই টিকে থাকে। সিজেপি আন্দোলন হয়তো একসময় প্রতিদিনের সংবাদপত্রের শিরোনাম থেকে হারিয়ে যাবে, কিন্তু এটি যে অভূতপূর্ব রাজনৈতিক জাগরণের প্রতিনিধিত্ব করছে, তা নিঃসন্দেহে আগামী দশকে ভারতের গণতন্ত্রের গতিপথ নির্ধারণ করবে।
