ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের প্রধানমন্ত্রী মাসরুর বারজানি পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন যে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান আঞ্চলিক সংঘাতে তাদের অঞ্চল কোনোভাবেই জড়িয়ে পড়তে চায় না। আল জাজিরার সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি উল্লেখ করেছেন যে কোনো পক্ষ থেকেই তাদের ওপর যুদ্ধে জড়ানোর জন্য কোনো ধরনের চাপ সৃষ্টি করা হয়নি। বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কুর্দি প্রশাসন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করছে।
চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার জেরে কুর্দি অঞ্চলের অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বারজানি। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে এই অঞ্চলে হাজারেরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। সরাসরি ইরান কিংবা ইরাকের অভ্যন্তরে তৎপর বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠীর মাধ্যমে এসব হামলা পরিচালিত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে তিনি বলেছেন যে যেকোনো সমস্যার সমাধান কেবল আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
চলতি বছরের মার্চ মাসে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর আল হারির বিমান ঘাঁটিতে বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল। মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই স্থাপনাটি লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলেও বারজানি স্পষ্ট করেছেন যে গত প্রায় দশ বছর ধরে সেখানে কোনো মার্কিন সেনা অবস্থান করছিল না। জঙ্গিগোষ্ঠী আইসিসের বিরুদ্ধে সফল অভিযানের পর থেকেই ওই ঘাঁটিটি খালি পড়ে ছিল। তবে কুর্দি অঞ্চলে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক বাহিনী কেবল সন্ত্রাস দমনের উদ্দেশ্যে অবস্থান করছে এবং তাদের উপস্থিতি নিয়মিত হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে বলে তিনি জানান।
ইরাকি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কুর্দি প্রশাসনের সহযোগিতার বিষয়টিও তুলে ধরেছেন বারজানি। অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অধীনে সমস্ত সশস্ত্র বাহিনীকে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে বাগদাদের নেওয়া উদ্যোগকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে কুর্দি আঞ্চলিক সরকার। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী চলতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে সব সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সরকারের কাছে সমর্পণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। কুর্দি নেতৃত্ব মনে করে যে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এই ধরনের আইনি পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক না থাকার বিষয়টি পুনরায় স্পষ্ট করেছেন কুর্দি প্রধানমন্ত্রী। এর বিপরীতে সিরিয়া এবং তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে তিনি জানান। সম্প্রতি কুর্দি অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট নেচিরভান বারজানি সিরিয়া সফর করে দেশটির নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যা দুই পক্ষের পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার সঙ্গে কুর্দি অঞ্চলের এই কূটনৈতিক যোগাযোগ মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
অন্যদিকে ইরানি কুর্দি বিরোধী দলগুলোর কার্যক্রম এবং বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতি নিয়ে আঞ্চলিক মহলে নানা আলোচনা চলছে। কুর্দি অঞ্চলে অবস্থিত এসব বিরোধী দলের ঘাঁটিগুলো বর্তমান উত্তেজনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। তবে কুর্দি প্রশাসন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে কুর্দি নেতৃত্ব সবসময় সংযত ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে যাবে বলে বারজানি তার সাক্ষাৎকারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ইরাকের কুর্দি অঞ্চল বহু বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির অন্যতম সংবেদনশীল পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত। বর্তমান সংঘাতের তীব্রতার মধ্যেও কুর্দি নেতৃত্ব কূটনৈতিক পরিপক্বতা প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের নিরাপদ রাখতে সচেষ্ট রয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বর্তমান সরকারের মূল অগ্রাধিকার বলে বারজানি পুনরায় নিশ্চিত করেছেন।
