রবিবার, ০৯ আগস্ট, ২০২৬, ২৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

মার্কিন নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব বলয় গড়ছে সৌদি ও তার মিত্ররা

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : আগস্ট ৯, ২০২৬, ০৮:৫৬ পিএম

মার্কিন নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব বলয় গড়ছে সৌদি ও তার মিত্ররা

সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে মক্কায় স্বাক্ষরিত নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। শুক্রবার স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একক নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছে বলে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এবং রয়টার্সের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এই পদক্ষেপটি মূলত বহুমাত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় নিজেদের প্রতিরক্ষা কৌশলকে আরও বহুমুখী করার একটি সুপরিকল্পিত উদ্যোগ।

গত শুক্রবার মক্কায় আয়োজিত এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই জোট নিছক কোনো সাধারণ আঞ্চলিক চুক্তি নয়। বরং এটি উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার একটি চেষ্টা। এর মাধ্যমে তারা এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলো বাইরের শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেরাই নিজেদের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে।

গত এক দশকের নানা ভূরাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ উপসাগরীয় দেশগুলোর কৌশলগত হিসাব নিকাশে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। এখন আর শুধু মার্কিন শক্তির বিশালত্বের ওপর ভরসা রাখা হচ্ছে না, বরং সেই শক্তির ব্যবহারের ধারাবাহিকতা নিয়েও মিত্রদের মনে প্রশ্ন উঠেছে। একটি দেশ শত শত কোটি ডলারের মার্কিন অস্ত্র কিনলেও বা মার্কিন ঘাঁটি স্থাপন করলেও সংকটের মুহূর্তে ওয়াশিংটনের পূর্ণ সহায়তা পাওয়া যাবে কি না, তা মূলত আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর নির্ভর করে। এই উপলব্ধি থেকেই রিয়াদ এবং তার প্রতিবেশীরা বুঝতে পেরেছে যে, ওয়াশিংটনের সাথে গভীর অংশীদারিত্ব থাকলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শতভাগ সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয় না। তাই তারা নিজেদের বিকল্প পথগুলো খোলা রাখছে।

এই কৌশলগত পরিবর্তনের অর্থ এই নয় যে, তারা মার্কিন বলয় ছেড়ে চীন বা রাশিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। বরং তারা সব ধরনের বলয় বা শিবিরের ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। যদি ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতি কমে যায়, তবে সেই শূন্যস্থান কে পূরণ করবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। বর্তমানে ইসরায়েল এবং ইরান এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই মক্কা চুক্তির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো একটি তৃতীয় শক্তি বলয় তৈরি করা, যা ইরান বা ইসরায়েল কারও সাথেই সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে না, তবে তাদের একচেটিয়া আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তার রোধ করতে সক্ষম হবে।

এই চুক্তির মাধ্যমে তিনটি শক্তিশালী দেশ তাদের নিজ নিজ সক্ষমতাকে একত্রিত করছে। সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল মূলধন, গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান এবং বড় প্রতিরক্ষা বাজার। অন্যদিকে তুরস্কের রয়েছে উন্নত সামরিক শিল্প কাঠামো, বিশেষ করে ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং নৌ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এর পাশাপাশি পাকিস্তান এই জোটে যুক্ত করেছে তাদের বিশাল অভিজ্ঞ সামরিক বাহিনী এবং পারমাণবিক সক্ষমতা। এই তিন দেশের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির সফলতা নির্ভর করবে দেশগুলোর মধ্যে সামরিক একীকরণের ওপর। যৌথ আকাশ প্রতিরক্ষা, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, সাইবার নিরাপত্তা এবং একটি সমন্বিত কমান্ড কাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে এই চুক্তিতে। শুধু তাই নয়, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের অস্ত্র ব্যবস্থা এখন থেকে সরাসরি সৌদি আরবে যৌথভাবে উৎপাদন এবং উন্নয়নের বিষয়েও আলোচনা চলছে। এর পাশাপাশি উপসাগর থেকে শুরু করে লোহিত সাগর পর্যন্ত সামুদ্রিক বাণিজ্য পথগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এই চুক্তির একটি বড় উদ্দেশ্য। যা কম স্পষ্ট তা হলো, আঞ্চলিক সংকটের মুহূর্তে এই দেশগুলো একে অপরকে রক্ষা করার জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত থাকবে। তবে এই চুক্তি যে মধ্যপ্রাচ্যের নিজস্ব নিরাপত্তা বলয় তৈরির ক্ষেত্রে একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে, তা অনেকটাই নিশ্চিত।

banner
Link copied!