দক্ষিণ আফ্রিকায় রবিবার ঐতিহাসিক নারী দিবসের ৭০তম বার্ষিকী পালিত হয়েছে, তবে আল জাজিরায় প্রকাশিত এক বিস্তৃত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, কয়েক দশকের রাজনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও দেশটির লাখ লাখ নারীর জন্য প্রকৃত লিঙ্গসমতা এবং শারীরিক নিরাপত্তা আজও পুরোপুরি অধরা রয়ে গেছে। প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক আন্দোলনের দীর্ঘ সময় পর দেশটিতে নারীদের বর্তমান অবস্থান নিয়ে নতুন করে এই উদ্বেগের কথা সামনে এসেছে।
প্রতি বছর ৯ আগস্ট পালিত হওয়া এই বিশেষ দিনটির শেকড় লুকিয়ে আছে ১৯৫৬ সালের এক বিশাল ও ঐতিহাসিক বিক্ষোভের মাঝে। ওই দিন প্রায় ২০ হাজার নারী তৎকালীন বর্ণবাদী সরকারের প্রস্তাবিত বৈষম্যমূলক পাস আইনের প্রতিবাদে প্রিটোরিয়ার ইউনিয়ন বিল্ডিং অভিমুখে এক সাহসী পদযাত্রা করেছিলেন। এই কঠোর আইনের মাধ্যমে মূলত আফ্রিকান নারীদের ওপর বিশেষ পরিচয়পত্র বহনের বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা তাদের স্বাভাবিক চলাফেরার স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে দিত এবং অকারণে পুলিশের তল্লাশির মুখে ফেলত।
সাউথ আফ্রিকান উইমেনস ফেডারেশন এবং আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের উইমেনস লিগের যৌথ নেতৃত্বে পরিচালিত এই আন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে চিরস্থায়ী স্বীকৃতি পেয়েছে। বিক্ষোভকারী নারীরা সেদিন তৎকালীন নেটিভ অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রীর কার্যালয়ে পিটিশন জমা দেন এবং প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে সরাসরি প্রতিবাদী গান গেয়ে ঘোষণা করেন যে, একজন নারীর ওপর আঘাত হানা মানে একটি কঠিন পাথরের ওপর আঘাত হানা। সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদদের মতে, নারীদের এই অভূতপূর্ব সাহসিকতা দক্ষিণ আফ্রিকার আধুনিক নারী অধিকার আন্দোলনের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছিল, যা পরবর্তী প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য একটি অনুপ্রেরণাদায়ী মডেল হিসেবে কাজ করেছে।
পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে যখন দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ প্রথার চূড়ান্ত অবসান ঘটে, তখন ১৯৫৬ সালের ওই বিক্ষোভের সুফল হিসেবে নারীরা রাজনীতিতে বড় ধরনের অর্জন দেখতে পান। সদ্য গড়ে ওঠা গণতান্ত্রিক দেশটিতে নারীদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পুরনো আন্দোলনকারীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এর ফলে বর্তমানে দক্ষিণ আফ্রিকার পার্লামেন্টের প্রায় ৪৫ শতাংশ সদস্যই নারী এবং মন্ত্রীসভায় তাদের অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ও বলিষ্ঠ উপস্থিতি রয়েছে, যা আইনি ও রাজনৈতিক সমতার ক্ষেত্রে গোটা বিশ্বের জন্য একটি বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে আল জাজিরার ওই বিশ্লেষণে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, এই রাষ্ট্রীয় ও আইনি সাফল্যের সাথে সাধারণ নারীদের প্রতিদিনকার বাস্তব জীবনের আকাশপাতাল তফাত রয়েছে। শক্তিশালী সাংবিধানিক সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও দেশটি বর্তমানে লিঙ্গভিত্তিক নারী নির্যাতনের এক ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারি ও স্বাধীন বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৮ বছরের বেশি বয়সী ৩৩ দশমিক ১ শতাংশ দক্ষিণ আফ্রিকান নারী তাদের জীবনে কোনো না কোনোভাবে ভয়াবহ শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এমনকি জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি ৫ জন পুরুষের মধ্যে অন্তত ১ জন নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন যে, তারা নিজেদের নারী সঙ্গীর ওপর মারাত্মক শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন চালিয়েছেন।
সমাজে নারীদের প্রতি এই চরম বৈষম্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও সমানভাবে দৃশ্যমান। বর্ণবাদ অবসানের পর সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশের নারী উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত জীবনযাপনের সুযোগ পেলেও, তৃণমূল পর্যায়ের লাখ লাখ নারী এখনও চরম দারিদ্র্যের মাঝে আটকে আছেন। পিছিয়ে পড়া ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর নারীরা প্রতিনিয়ত ভয়াবহ মাত্রার বেকারত্ব, অপর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা এবং একেবারেই মানহীন শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে তীব্র লড়াই করে টিকে আছেন।
বিশ্লেষকরা জোরালোভাবে মনে করেন, বর্ণবাদ আমলের মূল অর্থনৈতিক কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে ফেলতে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই সাধারণ নারীদের জন্য রাজনৈতিক সমতা বাস্তবে কোনো বস্তুগত উন্নয়ন বয়ে আনতে পারেনি। যা কম স্পষ্ট তা হলো, বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এই বিশাল অর্থনৈতিক ব্যবধান দূর করতে ঠিক কী ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। ৭০ বছরের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস স্মরণ করার পাশাপাশি মানবাধিকার বিশ্লেষকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সমাজে পূর্ণাঙ্গ নারী সমতা অর্জনের বিশাল দায়িত্ব কেবল নারীদের একার হতে পারে না। দশকের পর দশক ধরে নারীরা নিজেদের মৌলিক অধিকারের জন্য রাজপথে নিরলস লড়াই করে আসছেন, এবার একটি সত্যিকারের নিরাপদ ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে পুরুষদেরও এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে সাড়া দেওয়ার উপযুক্ত সময় এসে গেছে।
