মধ্যপ্রাচ্যের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় গত বছরের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মারাত্মক রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও নতুন এক খাদ্য সংকটের ছায়া নেমে এসেছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক সমন্বয় দপ্তর ওচার সাম্প্রতিক সতর্কবার্তায় জানানো হয়েছে যে গাজার বিশালসংখ্যক মানুষ বর্তমানে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে, যা যেকোনো সময় আনুষ্ঠানিক দুর্ভিক্ষের রূপ নিতে পারে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে যুদ্ধের ভয়াবহতা পেরিয়ে আসলেও গাজার শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি ও পুষ্টির বিষয়টি চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
মধ্য গাজার আল জাওয়ায়েদ শিবিরের একটি অস্থায়ী তাঁবুতে তিন সন্তানকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন সাহার আল বার্দিনি নামের এক নারী। তিন বছর আগে উত্তর গাজায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় তার স্বামী নিহত হওয়ার পর থেকেই তিনি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে লড়াই করে যাচ্ছেন। ছয় বছরের ওমর, চার বছরের সামা এবং তিন বছরের মাহমুদকে নিয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকার এই লড়াইয়ে তাকে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। গত বছরের আগস্ট থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত চলা তীব্র দুর্ভিক্ষের সময় তার সন্তানেরা মারাত্মক পুষ্টিহীনতা ও ওজন হ্রাসের শিকার হয়েছিল।
সাহার জানান যে সে সময় বাজারে ডিম কিংবা শাকসবজির মতো পুষ্টিকর খাবার পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল এবং দাম ছিল সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সম্পূর্ণ বাইরে। যদিও বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার কারণে তারা দিনে অন্তত এক বেলা খাবার জোগাড় করতে পারছেন, তবুও বিগত মাসের অপুষ্টির ধকল শিশুদের শরীর থেকে এখনো পুরোপুরি কাটেনি। ওমার ও সামার শারীরিক সুস্থতা ফিরে পেতে প্রায় ছয় মাস সময় লেগেছে। মায়ের আশঙ্কা, পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাবারের অভাবে তার সন্তানরা আবারও চরম দুর্বলতার শিকার হতে পারে।
জাতিসংঘ দফতর ওচার ফিলিস্তিন শাখার প্রধান জাস্টিন ব্র্যাডি সম্প্রতি সতর্ক করে বলেছেন যে গাজার জনসংখ্যার প্রায় সাতষট্টি শতাংশ মানুষ বর্তমানে তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি। এর মধ্যে প্রায় দুই লাখ মানুষ এমন সব ভয়াবহ পরিস্থিতিতে জীবনযাপন করছে যা সাধারণত আনুষ্ঠানিক দুর্ভিক্ষ ঘোষণার পূর্বলক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় সম্প্রদায় পরিচালিত রান্নাঘরগুলোই বহু পরিবারের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে। তবে সেখান থেকে মূলত ভাত ও সাধারণ কিছু উপকরণের খাবার সরবরাহ করা হলেও শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় আমিজ ও পুষ্টি উপাদান তাতে থাকে না বললেই চলে।
গাজা সিটির শেখ রাদওয়ান এলাকার বাস্তুচ্যুত মানুষদের একটি শিবিরে অনুরূপ দুরবস্থার কথা জানিয়েছেন শিমা নামের অপর এক মা। গত বছরের দুর্ভিক্ষের সময় দুই বছরের শিশুকন্যা সেলিনার জন্য এক ফোঁটা দুধও জোগাড় করতে পারেননি তিনি। বাধ্য হয়ে দুধের বিকল্প হিসেবে মেয়েকে ডাল বা অন্য যা পেতেন তাই খাইয়ে পেট ভরানোর চেষ্টা করতেন। দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেও মেয়ের মুখে পুষ্টিকর খাবার তুলে দিতে না পারার বেদনা তাকে প্রতিনিয়ত কুড়ে খায়। অপুষ্টির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবের কারণে সেলিনা এখনো অত্যন্ত দুর্বল ও অসুস্থ রয়ে গেছে।
পুষ্টি বিশেষজ্ঞ ডা. গাদা জিব্রিল এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে জানিয়েছেন যে বর্তমান খাদ্য সংকট অভিভাবকদের বাধ্য করছে শিশুদের শুধু ভাত ও ডালের মতো একঘেয়ে খাবার খাওয়াতে। এটি কেবল পেটের ক্ষুধা মেটায় ঠিকই, কিন্তু শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি থেকেই যায়। বিশেষ করে যেসব শিশু অতীতে তীব্র দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি হয়েছে, তাদের স্বাভাবিক ওজন ও সুস্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদী বিশেষ পুষ্টিসেবা এবং সুষম খাদ্যের প্রয়োজন হয়। কেবল পেট ভরানোর খাবার যথেষ্ট নয়, বরং আমিজ, লোহা ও ভিটামিনের মতো উপাদান অপরিহার্য।
গাজার সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা এতটাই ভেঙে পড়েছে যে খোলা বাজারে খাদ্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম সাধারণ মানুষের নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছে। ত্রাণসামগ্রী বা খাদ্য ভাউচার যা পাওয়া যায়, তা দিয়ে পরিবারের মৌলিক চাহিদা মেটানোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাপড়, ওষুধ এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম আকাশচোঁয়া হওয়ায় মায়েদের প্রথম অগ্রাধিকার থাকে যেকোনো উপায়ে শুধু সন্তানের মুখে এক মুঠো খাবার তুলে দেওয়া। অবরুদ্ধ এই উপত্যকায় শিশুদের সোনালী শৈশব আজ কেবলই বেঁচে থাকার কঠিন এক সংগ্রামে পর্যবসিত হয়েছে। যা কম স্পষ্ট তা হলো, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা ও ত্রাণ সরবরাহের মাধ্যমে এই আসন্ন মানবিক বিপর্যয় কত দ্রুত রোধ করা সম্ভব হবে।
