ইরাকের ইহুদি সম্প্রদায়ের উদ্যোগে বাগদাদে নতুন চালু হওয়া এই জাদুঘরে ভিড় জমাচ্ছেন বহু দর্শনার্থী। দেশটির ধর্মীয় সংখ্যালঘু এই জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য সংরক্ষণের চলমান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে নির্মিত হয়েছে এই প্রদর্শনী কেন্দ্র।
বাগদাদের ঐতিহাসিক আল-রশিদ সড়কের একটি পুরোনো ইহুদি বিদ্যালয় ভবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শামাশ ইহুদি জাদুঘর। ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক সম্পত্তিটি ইরাকি রাজধানীর ঠিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত।
ইরাকি ইহুদিদের সম্পত্তি দেখাশোনা করা কমিউনিটি কমিটির আইনজীবী আম্মার আল-তামিমি জানান, এটি ইরাকে ইহুদি সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন একমাত্র জাদুঘর।
জাদুঘরটির বড় কাঠের মূল প্রবেশদ্বারে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী মেনোরাহ ও রঙিন কাঁচের জ্যামিতিক নকশা। এর ভেতর প্রধান হলে সাজানো রয়েছে প্রাচীন দলিলপত্র, পুরোনো বিদ্যালয়ের সনদ এবং ইরাকি ইহুদিদের নানা আলোকচিত্র।
জাদুঘরের দেয়ালগুলো সুশোভিত করা হয়েছে বিশিষ্ট ইহুদি ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি দিয়ে। এর মধ্যে রয়েছেন ১৮৬০ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত বেঁচে থাকা ইরাকের প্রথম অর্থমন্ত্রী সাসুন এসকেল এবং ২০২১ সালে মারা যাওয়া চিকিৎসক জাফর ফুয়াদ এলিয়াহু, যিনি বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য বেশ পরিচিত ছিলেন।
প্রায় এক শতাব্দী আগে ইয়াকুব সোলায়মান শামাশ এই শামাশ ইহুদি বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিদ্যালয়টিতে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী, বিশেষ করে ইহুদি শিশুদের জন্য ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনার ব্যবস্থা ছিল।
তামিমির তথ্য অনুযায়ী, সত্তরের দশকে সরকার ভবনটি নিজেদের দখলে নিয়ে একটি সরকারি বিদ্যালয়ে রূপান্তর করে। পরবর্তীকালে আদালতের একটি রায়ের মাধ্যমে ১৯৯২ সালে সম্পত্তিটি আবার ইহুদি সম্প্রদায়ের কাছে ফেরত দেওয়া হয়।
তবে বিগত দশকগুলোতে এই বিদ্যালয়টি পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা একের পর এক বাধার মুখে পড়ে। নব্বইয়ের দশকের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসন, ২০০৬ ও ২০০৭ সালের সাম্প্রদায়িক সংঘাত এবং ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে দায়েশ গোষ্ঠীর উত্থান ছিল এসব প্রধান বাধা।
বর্তমানে ইরাকে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পাশাপাশি সংস্কৃতি ও বিনোদনের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। ৬৩ বছর বয়সী খালিদা ফুয়াদ এলিয়াহুর নেতৃত্বে ইহুদি সম্প্রদায়ের নেতারা তাদের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো আবার প্রাণবন্ত করে তুলতে এই সময়টিকে কাজে লাগাচ্ছেন।
একসময়ে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বৃহত্তম ইহুদি জনগোষ্ঠীর আবাসস্থল ছিল ইরাক। চল্লিশের দশকে দেশটিতে ১ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি ইহুদি বসবাস করতেন এবং এখানকার ইতিহাসের শেকড় ছড়ানো রয়েছে ২৬০০ বছর পেছনে।
১৯৪১ সালে ফারহুদ নামে পরিচিত এক রক্তক্ষয়ী সহিংসতার পর হাজার হাজার ইহুদি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। সেই হিংসাত্মক ঘটনায় দুর্বৃত্তদের হামলায় শতাধিক ইরাকি ইহুদি নিহত হন এবং পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর আরও বহু মানুষ দেশত্যাগ করেন।
বর্তমানে দেশটিতে মাত্র কয়েক ডজন ইহুদি নাগরিক অবশিষ্ট রয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই বসবাস করেন কুর্দিস্তান অঞ্চলে। পুরো ইরাক জুড়ে এখন ৫০টিরও কম সিনাগগ ও ইহুদি স্থাপনা টিকে আছে, যার অধিকাংশই কেন্দ্রীভূত রয়েছে বাগদাদ ও হিলায়।
