মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে ফেলার বা নিষ্ক্রিয় করার একটি নতুন সরকারি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে বলে বিবিসি নিউজ এবং রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও সম্প্রতি এক ঘোষণায় এই আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালকে লক্ষ্য করে কঠোর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান। ওয়াশিংটনের এই নতুন নীতি আন্তর্জাতিক আইন ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এই আদালতের এখতিয়ার কখনো স্বীকার না করলেও বর্তমান প্রশাসনের এই আগ্রাসী অবস্থান বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে এই আদালতের কার্যক্রম নস্যাৎ করার জন্য একটি সমন্বিত কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিযান পরিচালনা করা হবে। রুবিও অভিযোগ করেছেন যে এই আন্তর্জাতিক আদালত মার্কিন সেনাসদস্য এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অযৌক্তিক তদন্ত ও হয়রানি চালিয়ে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার্থে এবং অনির্বাচিত বৈশ্বিক আমলাদের প্রভাব কমাতে এই পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি বলে ওয়াশিংটন দাবি করেছে। তবে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন রাষ্ট্র এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেছে যে এটি বৈশ্বিক ন্যায়বিচার ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত রোম সনদের মাধ্যমে গঠিত একটি স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল হিসেবে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার করে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সনদে কখনো স্বাক্ষর না করলেও বিশ্বের শতাধিক দেশ এই আদালতের এখতিয়ার মেনে চলেছে। ফলে ওয়াশিংটনের এই একক সিদ্ধান্ত এবং হুমকি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে বৈশ্বিক শান্তি ও অপরাধের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই আদালতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে এই পদক্ষেপে মার্কিন মিত্র রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ইউরোপের দেশগুলো যারা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তারা ওয়াশিংটনের এই অবস্থান কীভাবে মূল্যায়ন করবে তা নিয়ে নানামুখী আলোচনা চলছে। তাছাড়া ভবিষ্যতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংঘাতে এই উত্তেজনার দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। কূটনৈতিক চ্যানেলে এই নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও মাঠের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কৌঁসুলিরা অতীতে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত পরিচালনা করেছেন। মার্কিন প্রশাসন আশঙ্কা করছে যে তাদের সামরিক বা রাজনৈতিক পদক্ষেপগুলোর কারণে ভবিষ্যতে এই আদালত বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। সেই আশঙ্কার বশবর্তী হয়েই ওয়াশিংটন আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই আগ্রাসী কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে কোনো দেশের একক আপত্তির কারণে একটি আন্তর্জাতিক আদালতের কার্যক্রম বন্ধ করা আইনিভাবে অত্যন্ত দুরূহ। তা সত্ত্বেও মার্কিন সরকারের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং ভিসা নীতির মতো কঠোর পদক্ষেপগুলো আদালতের কার্যক্রমকে সাময়িক বা দীর্ঘমেয়াদে ব্যাহত করতে পারে। বিশ্বজুড়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এই লড়াইয়ে বর্তমান রাজনৈতিক সমীকরণগুলো নতুন জটিলতার সৃষ্টি করছে।
