মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সম্পাদিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে লেবাননের সেনাবাহিনী দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের নির্দিষ্ট একটি পাইলট অঞ্চলে আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা মোতায়েন শুরু করেছে। সামরিক কমান্ডের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী সামরিক ইউনিটগুলো স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সকালে দক্ষিণাঞ্চলের নাবাতিয়া অঞ্চলের নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশ করেছে। দীর্ঘদিনের তীব্র সামরিক সংঘাত এবং সীমান্ত উত্তেজনার পর এই পদক্ষেপে দুই দেশের মধ্যকার সমঝোতা চুক্তির প্রথম মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সংঘাতের পর প্রথম বারের মতো রাষ্ট্রীয় বাহিনী নির্দিষ্ট এলাকায় তাদের কার্যক্রম শুরু করল।
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী গত সোমবার এই পাইলট অঞ্চলের পরিকল্পনা চালুর কথা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছিল। এর আগে ইসরায়েল এবং লেবাননের প্রতিনিধিদের মধ্যে রোম শহরে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক বৈঠকের পর এই সমঝোতা চূড়ান্ত হয়। ত্রিদেশীয় কাঠামোর আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং লেবাননের যৌথ সমন্বয় গ্রুপের তত্ত্বাবধানে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফেরাতে এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই পদক্ষেপকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টও এই অগ্রগতির ভূয়সী প্রশংসা করেছে।
লেবাননের সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে সেনারা প্রথম ধাপে সংশ্লিষ্ট এলাকার সুনির্দিষ্ট জনপদগুলোতে প্রবেশ করে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। তবে নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সাধারণ নাগরিকদের এখনই ওই এলাকায় না যাওয়ার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে মোতায়েনকৃত সামরিক বাহিনীর নির্দেশাবলী মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট এলাকার ভূখণ্ডে অতীতে সংঘটিত তীব্র লড়াইয়ের কারণে রয়ে যাওয়া বিস্ফোরক বা যুদ্ধাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করার কাজও ইতিমধ্যে শুরু করেছে সামরিক প্রকৌশলী দল।
বিশ্লেষকরা বলছেন যে এই সামরিক মোতায়েন প্রক্রিয়া লেবানন সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ও সামরিক পরীক্ষা। কারণ চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থাকবে এবং অন্য কোনো সশস্ত্র সংগঠনের উপস্থিতি বা অস্ত্র বহন অনুমোদিত হবে না। দীর্ঘকাল ধরে হিজবুল্লাহর শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই পাইলট প্রকল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে কাজ করবে। তবে ইসরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং অবৈধ অস্ত্র অপসারণের প্রক্রিয়াটি কতদূর সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে এখনো নানামুখী সংশয় ও রাজনৈতিক আলোচনা চলছে।
অন্যদিকে, লেবাননের প্রেসিডেন্ট বর্তমানে ওয়াশিংটন সফর করছেন এবং মার্কিন নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। লেবাননের রাষ্ট্রপ্রধান মার্কিন প্রশাসনের কাছে ইসরায়েলকে চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানাবেন যাতে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বাকি অংশ থেকেও সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। একই সঙ্গে লেবাননের সামরিক বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করার জন্য মার্কিন সহায়তার দাবিও জোরালো করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে গত মার্চ মাসে শুরু হওয়া সর্বাত্মক আঞ্চলিক সংঘাতের ফলে লেবাননে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী হাজার হাজার সাধারণ মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন এবং লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দেশটির বহু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, হাসপাতাল এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানের এই নতুন সমঝোতা ও সেনা মোতায়েন প্রক্রিয়া যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে দীর্ঘমেয়ায়ী স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং কূটনৈতিক মহল এই পরিস্থিতির অগ্রগতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
