ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে কঠোর নৌ অবরোধ ঘোষণা করার পর রিয়াদ এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বলে আল জাজিরা ও রয়টার্স নিশ্চিত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের কারণে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার প্রেক্ষাপটে এই নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি হলো। সৌদি আরব সম্প্রতি তাদের তেল রপ্তানি স্বাভাবিক রাখার জন্য লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর এবং বাবল মান্দেব প্রণালী ব্যবহার করার চেষ্টা করছিল, যা এখন সরাসরি হুতিদের হুমকির মুখে পড়েছে।
সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে দেশের বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেল সরবরাহ লাইন রক্ষা করার জন্য সব ধরনের প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। হুতি আন্দোলনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে ইয়েমেনের বন্দর ও বিমানবন্দরগুলোর ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা অবরোধের প্রতিক্রিয়েই তারা এই সামুদ্রিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে পারে এবং বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন যে হরমুজ প্রণালী ইতিমধ্যে বন্ধ থাকায় লোহিত সাগরের এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বিশ্ববাজারের তেল সরবরাহের একটি প্রধান বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। হুতিদের পক্ষ থেকে বাবল মান্দেব প্রণালীতে নৌ অবরোধ কার্যকর করা হলে এশিয়া এবং ইউরোপের প্রধান অর্থনীতিগুলোর জন্য তেল আমদানি ব্যয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং ভারতের মতো প্রধান আমদানিকারক দেশগুলো এর ফলে মারাত্মক অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে বলে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার ফলে সৃষ্ট এই পরিস্থিতি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক নতুন অশনি সংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। সৌদি আরব তাদের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পরিবহনের পথ নিরাপদ রাখতে নানা ধরনের কৌশলগত পদক্ষেপ নিলেও সামরিক সংঘাতের তীব্রতা তা কঠিন করে তুলছে। জাতিসংঘের মধ্যস্থতাকারীরা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই নতুন সংকটের প্রভাব নিরসনে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে গেলেও সংঘাতের তীব্রতা কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের রুট পরিবর্তন করা এবং অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করার কথা ভাবছে। বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থিত এই সামুদ্রিক পথগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা গেলে মুদ্রাস্ফীতি এবং জ্বালানি ঘাটতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তীব্র আকার ধারণ করবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমীকরণ কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নীতিনির্ধারকরা গভীর উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
