রবিবার, ০৩ মে, ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে কি ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি আসবে?

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : মে ৩, ২০২৬, ০২:৫৭ পিএম

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবে কি ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি আসবে?

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যখন গত মার্চ মাসে সৌদি আরবের রিয়াদে পা রাখলেন, তখন বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট ছিল উত্তাল। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক ত্রিভুজাকার যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ইউক্রেনের জন্য এক বড় বিপদ নিয়ে এসেছে কারণ বিশ্বের মনোযোগ এখন কিয়েভ থেকে সরে তেহরানের দিকে। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে যে ইউক্রেন এই সংকটকে অত্যন্ত সুকৌশলে নিজেদের শক্তি বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করছে। জেলেনস্কির এই সফর ছিল কেবল একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ নয় বরং ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিপণন করার এক সুচিন্তিত পদক্ষেপ।

ইউক্রেন এখন বিশ্বকে দেখাচ্ছে যে তারা আধুনিক ড্রোন যুদ্ধে কতটা পারদর্শী। বিশেষ করে ইরানের তৈরি শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের বিরুদ্ধে কিয়েভ যেভাবে রুখে দাঁড়িয়েছে, তা এখন সৌদি আরব, কাতার বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ এই দেশগুলোও সাম্প্রতিক সময়ে ইরান সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী বা সরাসরি ইরানের ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। জেলেনস্কি রিয়াদে বসে ঘোষণা করেছেন যে তারা উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে ড্রোন প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। এটি ইউক্রেনের জন্য কেবল একটি বাণিজ্যিক সাফল্য নয় বরং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিশালী দেশগুলোর সাথে একটি নতুন প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করার সুযোগ।

এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধবিরতির আলোচনাকে নতুন করে উসকে দিয়েছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন যে ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে তার আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে এবং তিনি ক্ষমতায় থাকলে খুব দ্রুত এই যুদ্ধের একটি সমাধান বের করতে পারবেন। ট্রাম্পের এই আত্মবিশ্বাস এবং পুতিনের সাথে তার ঘনিষ্ঠতা অনেককেই ভাবিয়ে তুলছে যে পর্দার আড়ালে হয়তো কোনো সমঝোতার খসড়া তৈরি হচ্ছে। যদিও জেলেনস্কি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে কোনো নমনীয়তা দেখাননি, তবে তিনি যেভাবে একের পর এক আন্তর্জাতিক সফর করছেন, তাতে স্পষ্ট যে তিনি সম্ভাব্য আলোচনার টেবিলে বসার আগে ইউক্রেনকে সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে চান।

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে তেল আমদানির ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। এটি প্রথম দিকে মস্কোর যুদ্ধ তহবিলে প্রচুর অর্থ জোগাচ্ছিল। কিন্তু ইউক্রেন বসে থাকেনি। তারা তাদের নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে একের পর এক আঘাত হানছে। জেলেনস্কির দাবি অনুযায়ী রাশিয়ার জ্বালানি খাত এখন কয়েক বিলিয়ন ডলার ক্ষতির সম্মুখীন। এমনকি তেলের দাম বাড়লেও ইউক্রেনীয় ড্রোনের আঘাতে রাশিয়া তাদের রপ্তানি সক্ষমতা হারাচ্ছে। এই পাল্টা আঘাত মস্কোকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করার অন্যতম বড় হাতিয়ার হতে পারে।

ইউরোপীয় মিত্রদের কাছ থেকেও ইউক্রেন এখন বড় ধরণের সহায়তা পাচ্ছে। সম্প্রতি নরওয়ে এবং জার্মানির সাথে ইউক্রেনের যে প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে, তার অংক শত কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে হাঙ্গেরিতে রুশ-ঘনিষ্ঠ নেতৃত্বের পতনের পর ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ৯০ বিলিয়ন ইউরোর একটি বিশাল ঋণ সহায়তা পাওয়ার পথ প্রশস্ত হয়েছে। এই অর্থ ইউক্রেনকে আগামী এক বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দেবে। একদিকে ড্রোন কূটনীতি আর অন্যদিকে আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা — এই দুইয়ে মিলে ইউক্রেন এখন এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে যেখানে রাশিয়া চাইলেই তাদের কোণঠাসা করতে পারবে না।

অবশ্য যুদ্ধবিরতি কি আদৌ সম্ভব কি না, তা নিয়ে এখনো সংশয় রয়ে গেছে। ট্রাম্পের ‍‍`দ্রুত সমাধান‍‍` হয়তো ইউক্রেনের জন্য কিছু ভূখণ্ড হারানোর ঝুঁকি নিয়ে আসতে পারে, যা কিয়েভ কখনোই মেনে নিতে চাইবে না। তবে ইরান সংকটের এই ডামাডোলে ইউক্রেন যেভাবে নিজের গুরুত্ব প্রমাণ করেছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে ভবিষ্যতের যেকোনো সমঝোতায় জেলেনস্কির শর্তগুলো উপেক্ষা করা সহজ হবে না। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ইউক্রেনকে একটি নতুন রণকৌশল শিখিয়েছে আর তা হলো বিপক্ষকে কেবল রণক্ষেত্রে নয় বরং অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকেও পঙ্গু করে দেওয়া। এই পথ ধরেই হয়তো আগামী মাসগুলোতে আমরা একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবনা দেখতে পাব।

banner
Link copied!