ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায় ওপেক প্লাস একটি প্রতীকী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। রোববার অনুষ্ঠিত এক ভার্চুয়াল বৈঠকে জোটের সাতটি প্রভাবশালী দেশ আগামী জুন মাসের জন্য তেল উৎপাদন কোটা সামান্য বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন এই জোটে আলজেরিয়া, ইরাক, কাজাখস্তান, কুয়েত, ওমান এবং রাশিয়া এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সম্মত হয়েছে। মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জোটের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
তবে এই উৎপাদন বৃদ্ধির ঘোষণাটি বর্তমান পরিস্থিতিতে অনেকটাই প্রতীকী হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকরা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধের ফলে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এই পথটি বন্ধ থাকায় সৌদি আরব, ইরাক এবং কুয়েতের মতো শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশগুলোর রপ্তানি ক্ষমতা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেলের একটি বিশাল অংশ পরিবহন করা হয়। সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় অচল হয়ে পড়ায় উৎপাদন কোটা বাড়ালেও বাস্তবে বিশ্ববাজারে তেলের যোগান বাড়ানো এখন প্রায় অসম্ভব।
এদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক ত্যাগের বিষয়টি এই বৈঠকে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে আমিরাত জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিলেও রোববারের বিবৃতিতে তাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। ওপেক প্লাসের একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে যে আমিরাতের চলে যাওয়া সত্ত্বেও জোটটি তার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চায়। সৌদি আরবের মতো শীর্ষ দেশগুলো দেখাতে চাইছে যে তারা পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। নতুন চুক্তি অনুযায়ী সৌদি আরবের উৎপাদনের কোটা জুন মাসে প্রতিদিন ১০.২৯১ মিলিয়ন ব্যারেলে উন্নীত হবে। যদিও গত মার্চে দেশটির প্রকৃত উৎপাদন ছিল মাত্র ৭.৭৬ মিলিয়ন ব্যারেল।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জীবনেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। যুদ্ধের প্রভাবে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি ১২৫ ডলার ছাড়িয়ে গেছে যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে বিমান চলাচলের জ্বালানি বা জেট ফুয়েলের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। এর ফলে কেবল পরিবহন খরচ নয় বরং বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতিও লাগামহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী মনে করছেন হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দিলেও স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থা ফিরে আসতে কয়েকমাস সময় লেগে যাবে।
ওপেক প্লাসের এই সিদ্ধান্ত মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তাও বটে। এর মাধ্যমে তারা বিশ্বকে জানাতে চাইছে যে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তারা সরবরাহ স্বাভাবিক করতে প্রস্তুত। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধের ময়দানে পরিস্থিতির উন্নতি না হচ্ছে এবং হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত তেলের বাজারে এই অস্থিরতা চলতেই থাকবে। ওপেকের তথ্যানুযায়ী গত মার্চ মাসে জোটের মোট উৎপাদন ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় প্রতিদিন ৭.৭ মিলিয়ন ব্যারেল কমে গেছে। এই বিশাল ঘাটতি পূরণ করা বর্তমান অবকাঠামো এবং যুদ্ধের অনিশ্চয়তার মাঝে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
