বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩

বৈশ্বিক প্রতিভা সন্ধান

ফুটবলার বাছাইয়ে ডেটা ও এআই: যেভাবে খুঁজছে বড় ক্লাব

উম্মাহ কণ্ঠ

প্রকাশিত: : সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম

ফুটবলার বাছাইয়ে ডেটা ও এআই: যেভাবে খুঁজছে বড় ক্লাব

বিশ্ব ফুটবলের তরুণ প্রতিভা খুঁজে বের করার শতবর্ষী চিরাচরিত ব্যাকরণ নীরবে বদলে গেছে। মাঠে বসে একজন স্কাউটের ব্যক্তিগত নোটবইয়ে সীমাবদ্ধ থাকার দিন পেরিয়ে ক্লাবগুলো এখন নজরদারির জন্য সর্বাধুনিক ডেটা অ্যানালিটিক্স, ভিডিও প্ল্যাটফর্ম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে। চিলির ক্লাব উনিভেরসিদাদ দে চিলিতে খেলার সময় যখন এক কিশোর ফুটবলারের গতি সবার নজর কাড়ছিল, তখন ইউরোপের তাবৎ বড় ক্লাব তার অবস্থান জানত।

ফুটবলে এখন অজ্ঞাত লুকানো রত্ন বলতে প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই।

চিলির তরুণ উইঙ্গার দারিও ওসোরিওকে যখন উনিশ বছর বয়সে ডেনমার্কের ক্লাব মিডজিল্যান্ডে আনা হয়, তখন এসি মিলান, আরবি লাইপজিগ কিংবা সালজবুর্গের মতো দলগুলো তার ওপর চোখ রাখছিল। তিন মৌসুম স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় পরিণত হওয়ার পর তিনি ধারে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের দল ক্রিস্টাল প্যালেসে যোগ দেন। তাকে দুই কোটি ৪০ লাখ পাউন্ডে পাকাপাকিভাবে কেনার শর্ত রয়েছে চুক্তিতে, যা বাস্তবায়িত হলে এটি হবে ডেনিশ লিগের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের দলবদল। প্রতিষ্ঠানটির কৌশলগত নীতিতে কাজ করা কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, মাঠে সশরীরে নজরদারি এবং নিজস্ব নেটওয়ার্কের পাশাপাশি এখন কম্পিউটারভিত্তিক ডেটা স্কাউটিং সমান তালে পরিচালিত হয়।

খেলোয়াড়দের মাঠে নামার বহু আগেই তাদের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল প্রোফাইল চলে আসছে বিশ্লেষকদের টেবিলে। শীর্ষ পাঁচ ইউরোপীয় লিগের ৬০ শতাংশের বেশি দল এবং প্রিমিয়ার লিগের অধিকাংশ ক্লাব এমন ডেটাবেজ ব্যবহার করছে, যেখানে ৪২টি দেশের চার লাখের বেশি তেরো থেকে একুশ বছর বয়সী ফুটবলারের তথ্য সংরক্ষিত।

আইভরি কোস্টের ক্লাব আসেক মিমোসাস থেকে সুইডেনের গোথেনবার্গ হয়ে ব্রাইটনে মূল দলে নাম লেখানো উইঙ্গার মালিক ইয়ালকুয়ে কিংবা নিউক্যাসলে নাম লেখানো বাজুমানা তোরে—সবাই উঠে এসেছেন এই ডিজিটাল নজরদারির মধ্য দিয়ে। একই পথ ধরে ইকুয়েডরের এলডিইউ কিতো থেকে হোসুয়ে কাইসেদো বার্সেলোনায় কিংবা মিসরের ক্লাব এনপিপিআই থেকে নুর আশরাফ লাইপজিগে গেছেন। প্রতিটি ম্যাচের ভিডিও বিশ্লেষণ করে দুই হাজারের বেশি তথ্য-উপাত্ত পৃথকভাবে নথিভুক্ত করা হয়। এতে করে কোন খেলোয়াড় কত দূরত্ব অতিক্রম করলেন বা কয়টি নিখুঁত আক্রমণাত্মক পাস দিলেন, তা মুহূর্তেই বের করা সম্ভব হচ্ছে।

তবে ডেটা যতই সমৃদ্ধ হোক, মাঠের পারিপার্শ্বিক বিবেচনা একেবারে বাদ দেওয়া যায় না। নতুন পরিবেশে একজন খেলোয়াড় মানিয়ে নিতে পারবেন কি না, তার পারিবারিক পটভূমি কেমন—এসব মানবিক উপাদান চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য এখনও অপরিহার্য। বিলম্ব না করে দ্রুত সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাই দলবদলের বাজারে এগিয়ে রাখছে অনেককে, কারণ সামান্য দ্বিধা করলেই বড় বাজেট নিয়ে অপেক্ষায় থাকা লিভারপুল বা চেলসির মতো পরাশক্তিরা সেই প্রতিভাকে দলে ভিড়িয়ে নেয়।

ইউরোপের প্রথাগত সীমানা পেরিয়ে স্কাউটারদের নজর এখন নতুন ভৌগোলিক বাজারে। এ বছর প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া মধ্য এশিয়ার দেশ উজবেকিস্তান এখন আন্তর্জাতিক ফুটবল মহলে আলোচনার কেন্দ্রে, যেখান থেকে উঠে এসে ম্যানচেস্টার সিটিতে নিজেকে প্রমাণ করছেন আবদুকাদির খুসানভ। ককেশাস অঞ্চলের দেশ আজারবাইজান নিজস্ব প্রতিভা নেটওয়ার্ক তৈরি করছে, আবার জাপানের তৃণমূল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে পেশাদার ফুটবলে আসার শৃঙ্খলাবদ্ধ কাঠামো বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হচ্ছে।

লাতিন আমেরিকা এবং আফ্রিকার বিস্তীর্ণ ফুটবল একাডেমিগুলো এখনও অফুরন্ত প্রতিভার উৎস। ব্রাজিলের মতো দেশে ক্রুজেইরোর মতো ক্লাব অনূর্ধ্ব-১৫ পর্যায়ে প্রতি একজন ফুটবলারকে নেওয়ার বিপরীতে চার হাজার জনকে বাদ দেয়। কিন্তু অজস্র প্রতিভাবান তরুণ উপযুক্ত দৃশ্যমানতা ও তথ্য সংরক্ষণের অভাবে আন্তর্জাতিক নজরে আসতে পারেন না। স্থানীয় ক্লাবগুলো তাদের তরুণদের ধরে রাখতে চাইলেও সঠিক সময় ও মূল্যে খেলোয়াড় হস্তান্তরের বৈশ্বিক বাজার প্রতিনিয়ত প্রশস্ত হচ্ছে। প্রযুক্তি ও ডেটা সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়ে বিশ্ব ফুটবলের প্রতিটি প্রান্তে ক্যামেরার লেন্স ও অ্যালগরিদমকে স্থায়ীভাবে বসিয়ে দিচ্ছে।

banner
Link copied!