স্মার্টফোন এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের শারীরিক গঠনে অত্যন্ত ক্ষতিকর পরিবর্তন আনছে বলে বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম BBC News এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণার বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে আমাদের নিত্যদিনের ডিজিটাল সঙ্গী ও ডিভাইসগুলো মানুষের ঘাড়ের আকৃতি পরিবর্তন, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস, পেশির শক্তি কমিয়ে দেওয়া এবং ত্বক নষ্ট করার মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে। দীর্ঘ সময় ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার এই প্রবণতা শুধু বাহ্যিক অবয়বই নষ্ট করছে না, বরং মানুষের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক সক্ষমতাও হ্রাস করছে বলে চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন কোনো ব্যক্তি মোবাইল বা ট্যাবলেটের স্ক্রিনের দিকে তাকানোর জন্য মাথা নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে রাখেন, তখন তার ঘাড়ে প্রায় ৬০ পাউন্ড বা ২৭ কেজি পর্যন্ত অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এই যান্ত্রিক সমস্যাকে টেক নেক বা প্রযুক্তির ঘাড় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে যা মেরুদণ্ডের হাড় ও জোড়ার স্থায়ী ক্ষতিসাধন করে থাকে। ক্রমাগত এই ভুল ভঙ্গিতে বসার কারণে পিঠ এবং কাঁধের পেশিগুলো অবশ হয়ে পড়ে এবং শরীরের স্বাভাবিক রক্ত সঞ্চালন ব্যাহত হয়। এই সমস্যা থেকে বাঁচতে চিকিৎসকেরা ডিভাইসগুলোকে চোখের সমান্তরালে বা মুখমণ্ডল থেকে এক হাত দূরত্বে রেখে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন এবং প্রতি আধা ঘণ্টা পর পর অন্তত ২০ মিনিটের জন্য বিরতি নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।
ইসলামে মানবদেহ ও স্বাস্থ্যকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পবিত্র আমানত এবং অত্যন্ত মূল্যবান নেয়ামত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানবজাতিকে সতর্ক করে এরশাদ করেছেন যে দুটি নেয়ামতের বিষয়ে অধিকাংশ মানুষ ধোঁকায় পড়ে থাকে, যার একটি হলো সুস্থতা এবং অপরটি হলো অবসর সময় (সহীহ আল-বুখারী, ৬৪১২)। অতএব, অবহেলা ও প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে নিজের এই সুস্থতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।
যুক্তরাজ্যের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ জাস্টিন হেক্সটালের মতে, দীর্ঘ সময় মাথা নিচু করে থাকার ফলে গলার চামড়াতেও অকাল বলিরেখা বা ভাঁজ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এর পাশাপাশি যারা দিনরাত হাত থেকে স্মার্ট ওয়াচ বা আধুনিক ঘড়ি খোলেন না, তাদের ত্বকের নিচে এক ধরনের আদ্র ও অন্ধকার পরিবেশ তৈরি হয় যা ক্ষতিকর ছত্রাক ও একজিমার জন্ম দেয়। এই ধরনের প্রযুক্তি পণ্যে ব্যবহৃত নিকেল, রাবার এবং বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান মানুষের সংবেদনশীল ত্বকে স্থায়ী অ্যালার্জির সৃষ্টি করতে পারে। এই ধরনের চর্মরোগ থেকে বাঁচতে নিয়মিত বিরতিতে ঘড়ি খুলে ত্বক পরিষ্কার রাখা এবং প্রয়োজনে বিশেষ প্রতিরক্ষামূলক ক্রিম ব্যবহার করা উচিত।
যা কম স্পষ্ট তা হলো, দীর্ঘমেয়াদে এই কৃত্রিম জীবনযাত্রা মানব প্রজাতির সার্বিক বিবর্তনে কোনো স্থায়ী নেতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে কি না। তবে আমেরিকার ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির চক্ষু বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডোনাল্ড মুত্তির একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে যে বর্তমানে বিশ্বজুড়ে মানুষের চোখের মায়োপিয়া বা ক্ষীণদৃষ্টির সমস্যা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে ঘরের ভেতরে কৃত্রিম আলোতে একটানা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখ তার স্বাভাবিক বিকাশ হারাচ্ছে। উজ্জ্বল সূর্যালোক মানুষের চোখের রেটিনা থেকে ডোপামিন নামক হরমোন নিঃসরণকে উদ্দীপতি করে যা চোখের সুরক্ষায় কাজ করে, কিন্তু মানুষ এখন ঘরের বাইরে সময় কাটানো প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
পূর্বে উল্লিখিত ঘাড়ের হাড়ের বিকৃতির মতোই চোখের এই মায়োপিয়া বা দৃষ্টিশক্তির অবক্ষয় মানুষের কর্মক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে দিচ্ছে। চোখের সুস্থতা বজায় রাখতে এবং প্রাকৃতিকভাবে পর্যাপ্ত ডোপামিন নিশ্চিত করতে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় খোলা আকাশের নিচে বা প্রকৃতির মাঝে কাটানো অত্যন্ত জরুরি। তবে তীব্র রোদে যাওয়ার সময় ত্বক ও চোখের সুরক্ষায় সানস্ক্রিন এবং রোদচশমা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন চক্ষু বিশেষজ্ঞরা। কৃত্রিম প্রযুক্তির অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা কাটিয়ে একটি সুশৃঙ্খল ও স্বাস্থ্যসম্মত জীবনধারা গড়ে তোলাই এখন মানবসভ্যতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
